গত পাঁচ মাসে দেশে হাম ও এর জটিলতায় মারা গেছে নয় শতাধিক মানুষ, যাদের সিংহভাগই শিশু। ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যু এখনো পুরোপুরি থামানো যায়নি। জুন থেকে জুলাইয়ের প্রথমভাগে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে মৃত্যুর সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে, যা নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে হাম পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করছে। সেই তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে (৬ থেকে ১২ তারিখ) হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যু হয়েছিল ১৭ জনের। পরের সপ্তাহে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩০-এ, আর তার পরের সপ্তাহে হয় ৩২। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে সাময়িকভাবে কমে ২৪ জনে নামলেও আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহে তা আবার বেড়ে যথাক্রমে ২৯ ও ৩৫ জনে পৌঁছায়। হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের তুলনায় আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, শতকরা হিসাবে যা ১০৬ ভাগ।
বিশ্বব্যাপী সংক্রামক রোগের তথ্য তুলনার ক্ষেত্রে সোমবার থেকে রোববার পর্যন্ত সময়কে একটি একক হিসেবে ধরার যে আন্তর্জাতিক রীতি প্রচলিত আছে, এই প্রতিবেদনেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন মাসের দিনসংখ্যার তারতম্যে হিসাবে গরমিল না হয়।
সরকারি তথ্য বলছে, মে মাসের শুরুর দিকে হামের প্রকোপ সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। এরপর ধীরে ধীরে মৃত্যুর হার কমতে থাকে এবং ১২ জুলাই পর্যন্ত মোট মৃত্যু দাঁড়ায় ৭৫৮ জনে। এরপর থেকে সংখ্যাটি আবার বাড়তে থাকে—২৬ জুলাই নাগাদ তা পৌঁছায় ৮২০ জনে, আর গতকাল সোমবার পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৯১৮ জনের। এর মধ্যে সরাসরি হামে মারা গেছে ৯৯ জন, বাকি ৮১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হামজনিত উপসর্গে।
রোগীর সংখ্যাও একই সময়ে বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ৬ জুলাই দেশে হাম ও উপসর্গের রোগী ছিল প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার, যাদের মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগী ছিল প্রায় ১৩ হাজার। ২৬ জুলাই নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে হয় যথাক্রমে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ও সাড়ে ১৫ হাজার। সবশেষ হিসাবে মোট উপসর্গের রোগী প্রায় দেড় লাখ ছাড়িয়েছে, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সোয়া লাখের বেশি মানুষ, ছাড়পত্র পেয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার জন।
সংক্রমণ এখনো পুরোপুরি না থামার পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন টিকাদানের ফাঁকফোকর। হাম-রুবেলা নির্মূল বিষয়ক জাতীয় যাচাই কমিটির প্রধান ও রোগতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণা সংস্থার সাবেক পরিচালক একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, সরকার পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকার আওতায় আনার চেষ্টা করলেও ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে, কারণ তারা টিকা নেওয়ার বয়সসীমায় পৌঁছায়নি। পাশাপাশি ছয় মাসের বেশি বয়সী সব শিশুও এখনো টিকার আওতায় আসেনি, ফলে সংক্রমণের চক্র সম্পূর্ণভাবে ভাঙা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে নতুন রোগী তৈরি হতেই থাকবে, আর হামের সাধারণ জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিলে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। তাঁর মতে, শুধু টিকাদান দিয়ে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়—জ্বর শুরু হওয়ার পর গায়ে দানা ওঠার আগেই হাম সবচেয়ে বেশি ছড়ায়, অথচ এই সময়ে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখার ব্যাপারে পরিবারগুলোকে যথেষ্ট সচেতন করা হয়নি। তাই টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা রাখা এবং জনগোষ্ঠী পর্যায়ে সংক্রমণ ঠেকানোর ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
এপ্রিল মাসের শুরুতে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি জেলার কয়েকটি উপজেলা ও পৌরসভায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, যা পরে চার সিটি করপোরেশন হয়ে পুরো দেশে সম্প্রসারিত করা হয়। ছয় মাস থেকে প্রায় পাঁচ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও দাবি করা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি।
তবে জাতীয় টিকাদান পরামর্শক গোষ্ঠীর একজন সাবেক সদস্য এই হিসাবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর ভাষ্যে, প্রকৃতপক্ষে যত শিশুকে টিকার আওতায় আনা দরকার ছিল, তা সম্ভব হয়নি। প্রচারণা, প্রস্তুতি ও লক্ষ্য নির্ধারণ—প্রতিটি ধাপেই ঘাটতি ছিল, যে কারণে সংক্রমণ প্রত্যাশিত হারে কমছে না।
এই প্রেক্ষাপটে টিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ১৬ লাখ শিশুকে নতুন করে টিকার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন প্রচারের মাধ্যমে রোগী ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে টিকাবিষয়ক সমন্বয় কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, টিকাযোগ্য শিশুর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে যে ঘাটতি ছিল, তার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে—একই বয়সসীমায় সেই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল প্রায় সোয়া দুই কোটি শিশু, যা হামের টিকা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হাম রোগীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের বয়স ছয় মাসের কম, আর বাকিদের মধ্যে বিভিন্ন বয়সসীমায় ছড়িয়ে রয়েছে আক্রান্তের সংখ্যা। তবে মৃত্যুর হিসাবে বৈষম্য আরও স্পষ্ট—নিশ্চিত হামে মৃতদের মধ্যে প্রায় এক-পঞ্চমাংশের বয়স ছয় মাসের কম, আর প্রায় তিন ভাগের একভাগের বয়স ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে। এর একটি বড় কারণ হলো, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের প্রথম ডোজ দেওয়া হয় নয় মাস বয়সে পৌঁছালে, ফলে তার আগে শিশুরা টিকার সুরক্ষা পাওয়ার আগেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে অবশ্য কিছুটা ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে—টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর হার ছিল প্রায় তিন-চতুর্থাংশ, যা কর্মসূচি চালুর পর কমে অর্ধেকের কিছু বেশিতে নেমে এসেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকাভিত্তিক ক্ষুদ্র পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যার মাধ্যমে কোন এলাকায় টিকাদানের হার কম, কোথায় এখনো কোনো টিকাই পায়নি এমন শিশু আছে এবং কোথায় নতুন টিকাদান কার্যক্রম দরকার—তা চিহ্নিত করা হবে। রোগতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণা সংস্থার একজন সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া শিশুদের পাশাপাশি পাঁচ বছরের বেশি বয়সী টিকাবঞ্চিত শিশুদের নিয়েও শুরু থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল। সময়মতো এই পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সংক্রমণ এতটা ছড়িয়ে পড়ত না বলে তাঁর অভিমত। তাঁর মতে, হামের মতো অতি সংক্রামক রোগ শুধু বড় হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, বরং জনগোষ্ঠী পর্যায়ে সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুগুলো চিহ্নিত করে আগেভাগে হস্তক্ষেপ জরুরি। তিনি এটিকে সাময়িক বা মৌসুমি প্রবণতা নয় বলে মন্তব্য করে বলেন, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে হাম নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, আক্রান্ত ও টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের শরীরে প্রকৃতপক্ষে কতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা যাচাইয়ে রক্ত পরীক্ষাভিত্তিক একটি জরিপ চালানো হচ্ছে, যা পরিচালনা করছে দেশের দুটি প্রধান গবেষণা সংস্থা। তিনি দাবি করেন, সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে—শুরুর দিকে যেখানে প্রতিদিন হাজারের বেশি উপসর্গের রোগী শনাক্ত হতো, এখন তা সব সময়ই হাজারের নিচে থাকছে। তাঁর ভাষ্যে, হামে মৃত্যু কমেছে এবং এখন নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মধ্য দিয়েই হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে। উপসর্গজনিত যেসব মৃত্যু ঘটছে, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল কারণ নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতা বলে তিনি জানান।

