বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন সামনে রেখে সরকার যে ‘জাতীয় ই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শনিবার, ২২ আগস্ট, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রথমে কয়েকটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এর কার্যকারিতা, সম্ভাব্য সমস্যা, ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা যাচাই করার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, একজন রোগীর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং অনুমোদিত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হলে সেই তথ্য দেখতে পারবে। এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রোগীদের এক চিকিৎসকের কাছ থেকে আরেক চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় পুরোনো ব্যবস্থাপত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন এবং চিকিৎসার ইতিহাসের বড় ফাইল সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হবে না। রোগী আগে কোথায় চিকিৎসা নিয়েছেন, কী পরীক্ষা করেছেন, কী ধরনের ওষুধ পেয়েছেন বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্বাস্থ্যসমস্যার চিকিৎসা চলছে কি না—এসব তথ্য চিকিৎসক দ্রুত জানতে পারবেন।
কাগজে এই পরিকল্পনা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই ব্যবস্থা কি শুধু শহরের প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত মানুষের সুবিধা বাড়াবে, নাকি গ্রামের দরিদ্র, বয়স্ক, কম শিক্ষিত এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অনভ্যস্ত মানুষও সমানভাবে এর সুফল পাবেন?
মোবাইল ফোন আছে মানেই ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহার করতে পারবেন—এমন নয়
বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহার এখন ব্যাপক। স্মার্টফোনের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু হাতে একটি স্মার্টফোন থাকা এবং সেই ফোন দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করার সক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপ অনুযায়ী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে এই হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এই ব্যবধানই জাতীয় ই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরির সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেতগুলোর একটি।
কারণ একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করলেই তা সবার জন্য কার্যকর হয়ে যায় না। একজন শহুরে শিক্ষিত তরুণ হয়তো কয়েক মিনিটের মধ্যে নিজের স্বাস্থ্যতথ্য দেখতে পারবেন, চিকিৎসক খুঁজে পাবেন বা চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনা বুঝতে পারবেন। কিন্তু গ্রামের একজন বয়স্ক কৃষক, কম শিক্ষিত নারী কিংবা স্মার্টফোন ব্যবহারে অনভ্যস্ত মানুষ একই কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন।
স্বাস্থ্যসেবা যদি প্রযুক্তিনির্ভর হয়, কিন্তু সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারার কারণে দরিদ্র মানুষ পিছিয়ে পড়ে, তাহলে ডিজিটাল উন্নয়ন নতুন ধরনের স্বাস্থ্যবৈষম্য তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই জাতীয় ই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শুধু একটি মোবাইলভিত্তিক সেবা বা ওয়েবসাইট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা হতে হবে, যেখানে প্রযুক্তির পাশাপাশি সরাসরি মানুষের সহায়তাও থাকবে।
গ্রামের মানুষের জন্য সহায়তাকারী ব্যবস্থা দরকার
বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ইতিমধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। জাতীয় ই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা গেলে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো বৃদ্ধ মানুষ নিজের স্বাস্থ্যতথ্য দেখতে না পারলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী তাঁকে সহায়তা করতে পারেন। কেউ নিজের নামে তথ্যভান্ডার খুলতে না জানলে কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রশিক্ষিত কর্মী তা করে দিতে পারেন। কেউ চিকিৎসকের নির্দেশনা বুঝতে না পারলে স্থানীয় পর্যায়ে তা সহজ ভাষায় বোঝানোর ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
ব্যবস্থাটিতে সহজ বাংলা নির্দেশনা, কণ্ঠনির্ভর সহায়তা, বড় ও স্পষ্ট বিকল্প এবং কম ধাপে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিশেষ করে কম শিক্ষিত, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, প্রবীণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে দুর্বল মানুষের অভিজ্ঞতাকে পরীক্ষামূলক পর্যায়ের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড করা প্রয়োজন।
কারণ প্রযুক্তির সাফল্য মাপা উচিত শুধু কতজন নিবন্ধন করেছেন তা দিয়ে নয়; বরং যারা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এবং সবচেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত, তারা আসলে সেবা ব্যবহার করতে পারছেন কি না—সেটি দিয়ে।
শুধু রোগীর তথ্য রাখা নয়, কোথায় চিকিৎসা নিতে হবে তাও জানানো দরকার
জাতীয় ই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার একটি শুধু রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসম্পর্কিত জ্ঞান বাড়ানোর একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যমও হতে পারে।
বাংলাদেশে অনেক মানুষ এখনো জানেন না কোন সমস্যার জন্য কোথায় যেতে হবে। সামান্য অসুস্থতায় কেউ বড় বিশেষায়িত হাসপাতালে ছুটে যান, আবার গুরুতর লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও কেউ স্থানীয় ওষুধ বিক্রেতা বা পরিচিত ব্যক্তির পরামর্শে সময় নষ্ট করেন। অনেক রোগী এক চিকিৎসকের কাছ থেকে আরেক চিকিৎসকের কাছে যান, বারবার পরীক্ষা করান এবং সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে দেরি করেন।
একটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই বিভ্রান্তি কমাতে পারে।
সেখানে সাধারণ উপসর্গ, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাস্থ্য, টিকাদান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, সংক্রামক রোগ এবং জরুরি অবস্থার বিষয়ে সহজ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকতে পারে।
এই তথ্য অবশ্যই চিকিৎসকের রোগ নির্ণয়ের বিকল্প হবে না। কিন্তু একজন মানুষকে অন্তত বোঝাতে পারবে—তাঁর প্রথমে কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়া উচিত, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়া উচিত, জেলা হাসপাতালে যাওয়া দরকার, নাকি সরাসরি বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।
এমনকি কিছু সতর্কতামূলক লক্ষণের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার নির্দেশনাও থাকতে পারে।
এতে দুটি সুবিধা হতে পারে। একদিকে অপ্রয়োজনে বড় হাসপাতালের ওপর চাপ কিছুটা কমবে, অন্যদিকে গুরুতর রোগী সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন।
হাসপাতাল খুঁজে দেওয়ার আগে হাসপাতালটি বৈধ কি না জানতে হবে
একটি জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীকে যদি কোনো হাসপাতাল বা রোগনির্ণয় কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের মান ও বৈধতা সম্পর্কে রাষ্ট্রের নিশ্চিত হওয়াও জরুরি।
সরকার মার্চ মাস থেকে অবৈধ ও নিম্নমানের হাসপাতাল, ক্লিনিক, রক্তকেন্দ্র এবং রোগনির্ণয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের প্রথম পাঁচ মাসে প্রায় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে এবং ২৫০টির বেশি অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এই তথ্যই দেখায়, দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে মান নিয়ন্ত্রণ কত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় ই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সরকার যদি দেশের বৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক, রোগনির্ণয় কেন্দ্র এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের একটি নিয়মিত হালনাগাদ করা জাতীয় তালিকা তৈরি করে, তাহলে একজন রোগী সহজেই যাচাই করতে পারবেন কোথায় নিরাপদ ও অনুমোদিত সেবা পাওয়া যাবে।
তবে শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা দিলেই যথেষ্ট হবে না। কোন হাসপাতাল কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে এবং বাস্তবে সেই সেবা দেওয়ার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আছে কি না, সেটিও উল্লেখ করা দরকার।
কোনো রোগীর যদি কিডনি ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়, তাহলে তিনি কাছাকাছি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান দেখতে পারবেন। একইভাবে হৃদ্রোগ চিকিৎসা, প্রসূতিসেবা, ক্যানসার চিকিৎসা, চোখের অস্ত্রোপচার বা বিশেষ ধরনের রোগনির্ণয় পরীক্ষার জন্য কোথায় যেতে হবে, সেটিও জানা যাবে।
এতে রোগীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলোমেলোভাবে প্রতিষ্ঠান খুঁজতে বা দালালের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা অনিয়মও কমাতে পারে
সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বৈধ প্রতিষ্ঠানের একটি প্রকাশ্য তালিকা থাকলে তার আরেকটি বড় সুবিধা রয়েছে। কোনো হাসপাতাল বা রোগনির্ণয় কেন্দ্র যদি সেই তালিকায় না থাকে, তাহলে রোগী সহজেই সন্দেহ করতে পারবেন যে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন বা নিবন্ধনে সমস্যা থাকতে পারে।
একজন নাগরিক চাইলে দেখতে পারবেন কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমতিপত্র বৈধ কি না, সেটি কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে এবং সেখানে কর্মরত চিকিৎসকদের নিবন্ধন সঠিক আছে কি না।
এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু রোগীর তথ্য সংরক্ষণের জায়গা থাকবে না; বরং স্বাস্থ্যখাতের জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার মাধ্যমও হয়ে উঠতে পারে।
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অনুমতিপত্রের মেয়াদ সম্প্রতি দুই বছর করার সরকারি সিদ্ধান্তও এমন একটি হালনাগাদযোগ্য তথ্যব্যবস্থার প্রয়োজন আরও বাড়িয়েছে। কারণ অনুমোদনের সময়সীমা বড় হলে নিয়মিত পরিদর্শন ও তথ্য হালনাগাদ না থাকলে নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য
কোটি মানুষের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হলে তথ্যের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন মানুষের চিকিৎসার ইতিহাস তাঁর সবচেয়ে ব্যক্তিগত তথ্যগুলোর মধ্যে একটি। কার কী রোগ আছে, কোন চিকিৎসা চলছে, কী ধরনের পরীক্ষা হয়েছে কিংবা অতীতে কী স্বাস্থ্যসমস্যা ছিল—এসব তথ্য অনুমতি ছাড়া অন্য কারও হাতে যাওয়া উচিত নয়।
প্রধানমন্ত্রীও তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কারা একজন রোগীর তথ্য দেখতে পারবেন, কতক্ষণ দেখতে পারবেন এবং কে কখন তথ্য দেখেছেন—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন। রোগীর অনুমতি ছাড়া অপ্রয়োজনীয়ভাবে তথ্য ব্যবহার বা ভাগ করার সুযোগ যেন না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
তবে নিরাপত্তার নামে ব্যবস্থা এত কঠিন করে ফেলা যাবে না যে সাধারণ মানুষই নিজের তথ্য দেখতে না পারেন। এখানেই সবচেয়ে বড় ভারসাম্যের প্রয়োজন—তথ্য যথেষ্ট নিরাপদ থাকবে, কিন্তু ব্যবহার এতটাই সহজ হবে যে গ্রামের একজন সাধারণ মানুষও প্রয়োজনীয় সহায়তায় তা ব্যবহার করতে পারবেন।
পরীক্ষামূলক প্রকল্পে শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষকেও পরীক্ষা করতে হবে
সরকার কয়েকটি জেলায় প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থা চালুর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সারা দেশে একসঙ্গে ব্যবস্থা চালুর আগে বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার সুযোগ থাকবে।
কিন্তু পরীক্ষার বিষয় শুধু সফটওয়্যার কাজ করছে কি না, সার্ভার কতটা শক্তিশালী, কত টাকা ব্যয় হচ্ছে বা তথ্য কতটা নিরাপদ—এগুলোতেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
একজন গ্রামের বৃদ্ধ এই ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারছেন কি না, কম শিক্ষিত নারী নিজের চিকিৎসার তথ্য বুঝতে পারছেন কি না, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা আছে কি না, ইন্টারনেট দুর্বল হলে কী হবে এবং স্মার্টফোন না থাকলে সেবা কীভাবে পাওয়া যাবে—এসবও পরীক্ষা করতে হবে।
বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর আলাদা ব্যবহারিক পরীক্ষা না হলে জাতীয় পর্যায়ে চালু হওয়ার পর বড় বৈষম্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
প্রযুক্তি চিকিৎসকের অভাব পূরণ করতে পারবে না
ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরিও ঠিক হবে না।
একটি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা এমন জায়গায় চিকিৎসক তৈরি করতে পারবে না যেখানে চিকিৎসক নেই। একটি নিম্নমানের হাসপাতালকে শুধু জাতীয় তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করলেই সেটি ভালো হাসপাতাল হয়ে যাবে না। চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর খারাপ আচরণও প্রযুক্তি দিয়ে পুরোপুরি বদলানো সম্ভব নয়।
তবে প্রযুক্তি এমন কিছু সমস্যা সমাধান করতে পারে, যেগুলো বর্তমানে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
একই রোগীর চিকিৎসার তথ্য বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকা কমানো সম্ভব। রোগীকে বারবার একই পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন কিছু ক্ষেত্রে কমতে পারে। কোথায় কোন সেবা পাওয়া যায় তা জানানো সম্ভব। অনুমোদিত স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করা যায়। অবৈধ প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, রোগী, চিকিৎসক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্যের ব্যবধান কমানো সম্ভব।
দরিদ্র মানুষের জন্য কার্যকর না হলে প্রকল্পের সাফল্য অসম্পূর্ণ
বাংলাদেশের জাতীয় ই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে একটি খুব সাধারণ প্রশ্নের ওপর—একজন দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনের সময় এটি ব্যবহার করে বাস্তব সুবিধা পাচ্ছেন কি না।
শহরের শিক্ষিত ও প্রযুক্তিবান্ধব মানুষের জন্য একটি অত্যাধুনিক ব্যবস্থা তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কঠিন কাজ হলো এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যা প্রত্যন্ত গ্রামের প্রবীণ, কম শিক্ষিত মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সীমিত আয়ের পরিবারের সদস্যও ব্যবহার করতে পারেন।
তাই শুরু থেকেই কয়েকটি বিষয়কে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে—সহজ বাংলা ভাষা, কণ্ঠনির্ভর নির্দেশনা, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা, কম ইন্টারনেটেও ব্যবহারের সুযোগ, নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য, অনুমোদিত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তালিকা এবং রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের কঠোর নিরাপত্তা।
জাতীয় ই-স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যদি শুধু রোগীর পুরোনো ব্যবস্থাপত্র জমা রাখার ডিজিটাল ভান্ডার হয়, তাহলে এর সম্ভাবনার একটি ছোট অংশই কাজে লাগবে। বরং এটিকে এমন একটি জাতীয় স্বাস্থ্যদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষ জানতে পারবেন তাঁর চিকিৎসার ইতিহাস, কোন সমস্যায় কোথায় যেতে হবে, কাছাকাছি কোন প্রতিষ্ঠান বৈধ, কখন দ্রুত চিকিৎসা দরকার এবং কীভাবে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সব সমস্যা প্রযুক্তি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রযুক্তি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিচ্ছিন্ন অংশগুলোকে এক জায়গায় আনতে পারে, তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে এবং রোগীকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্যবস্থাটি যেন এমন না হয় যেখানে মানুষকে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করা হয়। বরং প্রযুক্তিকেই মানুষের প্রয়োজন, সক্ষমতা ও বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
কারণ জাতীয় ই-স্বাস্থ্য উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য তখনই হবে, যখন দেশের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষটিও বলতে পারবেন—এই ব্যবস্থা আমার চিকিৎসা পাওয়া সত্যিই সহজ করেছে।

