দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকায় ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছেন তরুণ বয়সীরা। চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী, আর মৃত্যুর হিসাবেও শীর্ষে রয়েছে এই একই বয়সসীমার মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছর এই বয়সসীমার প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা এই প্রবণতার একটি বাস্তব উদাহরণ। কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগলেও প্রথমে তা সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে করে গুরুত্ব দেননি তিনি। দুই-তিন দিন পর জ্বর কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক কাজকর্মও শুরু করে দেন। কিন্তু এরপরই হঠাৎ শরীর দুর্বল হয়ে পড়া, বমি ও গায়ে র্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরীক্ষায় ধরা পড়ে তার রক্তের প্লাটিলেট মারাত্মকভাবে কমে গেছে, ফলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, এই তরুণের মতো অনেকের ক্ষেত্রেই জ্বর কমে যাওয়ার পরই আসলে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায় শুরু হয়। জ্বর সেরে গেছে ভেবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়াটাই তখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩৪২ জন, যদিও এই সময়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এ নিয়ে চলতি বছর মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৫৯০ জনে, আর মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ৮৮ জনে।
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আক্রান্তের দিক থেকে ২৬-৩০ বছর বয়সীদের পরই রয়েছে ২১-২৫ বছর বয়সীরা, যাদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ। এরপরের অবস্থানে ১৬-২০ বছর বয়সীরা, যাদের আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজারের কাছাকাছি। আর ৩১-৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ। অর্থাৎ চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় একটি অংশই তরুণ ও যুব বয়সী।
মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষণীয়। ২৬-৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৬ জনের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ৪৫-৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে—১২ জন। এ ছাড়া ৩৬-৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে ১০ জন, ৩১-৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে নয়জন এবং ২১-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, তরুণদের মধ্যে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টাকে অবহেলা করা। সাধারণত ডেঙ্গুর শুরুর তিন থেকে পাঁচ দিন জ্বর থাকে, এরপর পঞ্চম থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে অনেক রোগীর জ্বর কমে আসে। এই সময়টাতেই রোগী নিজেকে সুস্থ ভাবতে শুরু করেন, অথচ শরীরের ভেতরে তখন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে।
একজন চিকিৎসক এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করে বলেন, জ্বর কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক রোগীর রক্তচাপ ও প্লাটিলেটের মাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। শরীর থেকে তরল বেরিয়ে গিয়ে রক্তের আয়তন কমে গিয়ে তৈরি হতে পারে গুরুতর শারীরিক জটিলতা, যাতে রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।
তার মতে, তরুণ বয়সে সাধারণত অন্যান্য জটিল রোগ কম থাকায় অনেকেই ডেঙ্গুর ঝুঁকিকে হালকাভাবে নেন এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েন। কিন্তু জ্বর কমে যাওয়া মানেই বিপদ কেটে যাওয়া নয়—এই সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং শরীরের পরিবর্তনগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্তদের মধ্যেও পুরুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মোট ভর্তি হওয়া ৩৪২ জনের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পুরুষ, বাকিরা নারী। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগে, এরপর যথাক্রমে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং রংপুর বিভাগে।
তবে স্বস্তির খবর হলো, একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৪৫ জন রোগী। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩০ হাজার ৪২২ জন, যা ডেঙ্গু মোকাবিলায় চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিকও তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ বয়সীদের মধ্যে এই ঝুঁকি হ্রাসে সবচেয়ে জরুরি হলো ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি—বিশেষত জ্বর কমে যাওয়ার পরের সময়টিকে বিপদমুক্ত না ভেবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা এবং শরীরের পরিবর্তনের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা।

