বর্ষা মৌসুম এলেই বেড়ে যায় ডেঙ্গুর প্রকোপ। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর বাড়ির চারপাশে সামান্য পরিমাণ জমে থাকা পানিও পরিণত হতে পারে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে। মাত্র কয়েকদিন জমে থাকা পানিতেই লার্ভা থেকে দ্রুত জন্ম নিতে পারে অসংখ্য মশা, যে কারণে বর্ষায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে।
এবারও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামেও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। চিকিৎসকরা মনে করছেন, অনিয়মিত বৃষ্টি ও উষ্ণ আবহাওয়া এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য এক ধরনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। তাই শুধু জ্বর হলেই চিকিৎসা নেওয়া নয়, রোগটি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে রাখাও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের ভাষ্যমতে, এডিস মশা মূলত দিনের আলোতেই বেশি সক্রিয় থাকে, বিশেষ করে সকাল ৮টা থেকে ১০টা এবং বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৮টার মধ্যে এই মশার কামড়ানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, আর সাধারণত পায়ের নিচের দিকেই কামড়ায় বেশি। তাই দিনের এই সময়গুলোতে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা এবং শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
ডেঙ্গু ছড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কোনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর ভাইরাস মশার শরীরে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে সেই মশা অন্য কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তার শরীরেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে একজন আক্রান্ত ব্যক্তিকেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি, নয়তো সংক্রমণের চক্র আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সাধারণভাবে অনেকেই মনে করেন, ডেঙ্গু মানেই শুধু জ্বর ও প্লেটলেট কমে যাওয়া। তবে বাস্তবতা এর চেয়ে জটিল। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ বেশি হলে লিভারের কার্যক্ষমতার ওপরও চাপ পড়তে পারে, যার ফলে লিভার বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর পাশাপাশি পেটে তরল জমে যাওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে। তাই শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখেই রোগীর প্রকৃত অবস্থা বিচার করা ঠিক নয়—লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো, জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে বলে ধরে নেওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বর সেরে যাওয়ার পরের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ এই সময়ে শরীরে পানিশূন্যতা ও তরলের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে, যা বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও লিভারসহ একাধিক অঙ্গ একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গুরুতর জটিলতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, জন্ডিস, খিঁচুনি বা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয় বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা। শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরের পাশাপাশি গাঁটে বা পেশিতে ব্যথা, খিঁচুনি কিংবা গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষত শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে কোনোভাবেই দেরি করা উচিত নয়।
রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব রয়েছে বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। জ্বরের শুরুর দিকে নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হয়, আর জ্বর কয়েকদিন পার হয়ে গেলে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা কিংবা ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্তকরণের পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর উপসর্গ ও অসুস্থতার সময়কাল বিবেচনা করেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন কোন পরীক্ষা কখন প্রয়োজন।
শরীরে পানিশূন্যতা প্রতিরোধে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং অল্প অল্প করে বারবার সহজপাচ্য খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে শুধু বেশি পানি পান করলেই ডেঙ্গুর চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয়ে যায়—এমন ধারণাও ভুল বলে সতর্ক করেছেন তারা।
সবশেষে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপর। ছাদ, বারান্দা, টব বা যেকোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে তা নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং মশারি বা মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের মাধ্যমেই এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের পরামর্শ, প্লেটলেটের সংখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত না হয়ে রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার প্রতি নজর রাখাই ডেঙ্গুর জটিলতা এড়ানোর মূল চাবিকাঠি।

