দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি যখন দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে, তখন এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের মধ্যে দেখা গেছে চোখে পড়ার মতো অসামঞ্জস্য। একই সময়ের একই হাসপাতালের তথ্য নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এত বড় পার্থক্য থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
রাজধানীর সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে মধ্য-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে ডেঙ্গুতে ভর্তি হয়েছেন প্রায় সাড়ে চারশ রোগী, মৃত্যু হয়েছে পঁয়ত্রিশ জনের। অথচ একই সময়ের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে সেই হাসপাতালেই ভর্তি রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে সতেরোশ, আর মৃত্যু দেখানো হয়েছে ছাব্বিশ জনের। অর্থাৎ ভর্তি রোগীর হিসাবে বারোশর বেশি এবং মৃত্যুর হিসাবে নয়জনের গরমিল স্পষ্ট।
আরও অস্বাভাবিক লেগেছে দৈনিক পরিসংখ্যানে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে প্রতিদিন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল দেড়শ থেকে দুইশর মধ্যে ওঠানামা করা। কিন্তু অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে টানা বারো দিন একই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে বাহাত্তর জন করে— যা পরিসংখ্যানের স্বাভাবিক ওঠানামার ধারার সঙ্গে মেলে না।
একই চিত্র মিলেছে রাজধানীর আরেকটি বড় সরকারি হাসপাতালেও। হাসপাতালটির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিনই দেড়শর বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল তাদের হাসপাতালে। কিন্তু অধিদপ্তরের তথ্যে একই সময়ে ভর্তি রোগী দেখানো হয়েছে পঞ্চাশের কম করে। নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যায়ও ফারাক চোখে পড়ার মতো— হাসপাতাল যেখানে প্রতিদিন গড়ে পঞ্চাশের বেশি নতুন রোগীর তথ্য দিচ্ছে, অধিদপ্তরের হিসাবে কোনো কোনো দিন নতুন রোগীর সংখ্যা শূন্যও দেখানো হয়েছে।
পুরান ঢাকার একটি হাসপাতালেও একই ধরনের ব্যবধান লক্ষ করা গেছে। হাসপাতাল সূত্র বলছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে দৈনিক ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ষাট থেকে সত্তরের ঘরে, যেখানে অধিদপ্তরের হিসাবে তা দেখানো হয়েছে চল্লিশের নিচে।
এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, একদিন-দুইদিনের তথ্যে গরমিল হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে, কারণ তথ্য এন্ট্রির কাজ মানুষই করে। কিন্তু টানা দিনের পর দিন বড় একটি হাসপাতালের তথ্যে এমন ব্যাপক অসামঞ্জস্য থাকা এবং প্রতিদিন একই সংখ্যা দেখানো থেকে স্পষ্ট হয়, তথ্য প্রকাশে গাফিলতি আছে অথবা প্রকৃত চিত্র ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হচ্ছে।
আরেকজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, সংকটকালে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রকৃত তথ্য কম দেখানোর একটি প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যায়, যার পেছনে থাকে সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার ভুল ধারণা। তার মতে, সত্য গোপন রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এবং গুজব ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কীটতত্ত্ববিদও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ডেঙ্গুর সংক্রমণস্থল চিহ্নিত করতে হলে নির্ভুল পরিসংখ্যান অপরিহার্য। টানা এক ডজন দিন একই সংখ্যক রোগী ভর্তি দেখানো হলে তা পরিসংখ্যান কারচুপির সন্দেহ তৈরি করে, এবং বিষয়টি সত্য হলে সেটি জনগণের সঙ্গে বড় ধরনের বিশ্বাসভঙ্গের সমান।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, এমন অসংগতি থাকলে তা যাচাই করা হবে এবং কোথাও ভুল থাকলে সংশোধন করা হবে। তথ্য গোপনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, চলতি বছরের ডেঙ্গু সংক্রমণ আগের বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলেও তারা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, যা প্রমাণ করে তথ্য গোপনের চেষ্টা হচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, একদিনেই দেশজুড়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন আটজন এবং নতুন ভর্তি হয়েছেন সাড়ে সতেরোশর বেশি রোগী। দেশের সব বিভাগেই এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে ঢাকা বিভাগ ও দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মোট মৃত্যু দেড়শ ছাড়িয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিপ্পান্ন হাজার মানুষ।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, একদিকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ যেমন বাড়ছে, তেমনি সরকারি তথ্যব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন জোরদার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সংকটকালে স্বচ্ছ ও নির্ভুল তথ্য প্রকাশ না হলে তা রোগ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই হাসপাতাল ও কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানের এই ফারাক দূর করে একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

