যক্ষ্মা, এইচআইভি-এইডস ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি পুষ্টিগত সহায়তা দিতে বড় পরিসরের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের আওতায় চিকিৎসাধীন রোগীরা প্রতি মাসে ৮২০ টাকা করে সহায়তা পাবেন— যক্ষ্মা রোগীরা ছয় মাস এবং এইচআইভি ও ম্যালেরিয়া আক্রান্তরা এক বছর ধরে এই সুবিধা ভোগ করবেন।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, এই তিন রোগে আক্রান্তদের পুষ্টি সহায়তা বাবদ মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১৭ কোটি টাকা, যা যক্ষ্মা, এইচআইভি-এইডস ও ম্যালেরিয়া মোকাবিলার সমন্বিত একটি স্বাস্থ্য প্রকল্পের অংশ। পুরো প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ৩৯ কোটি টাকা, যা বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সিংহভাগ— প্রায় তিন হাজার ১৬৯ কোটি টাকা— আসবে সরকারের নিজস্ব কোষাগার থেকে, বাকি ৮৭০ কোটি টাকা দেবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা গ্লোবাল ফান্ড। এই অর্থের একটি বড় অংশ, প্রায় ১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ব্যয় হবে চিকিৎসাসামগ্রী কেনায়— যার মধ্যে ওষুধ ও টিকা কিনতেই লাগবে প্রায় ৯৫৯ কোটি টাকা। এছাড়া গবেষণাগার সরঞ্জাম, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী এবং সীমিত পরিসরে অবকাঠামো নির্মাণেও অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রশাসনিক খাতেও উল্লেখযোগ্য ব্যয় ধরা হয়েছে— কম্পিউটার সফটওয়্যার, সেমিনার-সম্মেলন, পরামর্শক সেবা, আউটসোর্সিং এবং প্রশিক্ষণে মিলিয়ে কয়েকশ কোটি টাকা। প্রকল্পটি চলবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত।
প্রকল্পের অন্যতম বড় লক্ষ্য প্রায় দশ লাখ যক্ষ্মা রোগীকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা। এদের মধ্যে চিকিৎসাধীন প্রায় সাড়ে আট লাখ রোগীকে ছয় মাস ধরে পুষ্টি সহায়তা দেওয়া হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিতে স্বীকার করা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের যক্ষ্মা-ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি দেশের একটি, যেখানে প্রতি বছর প্রায় চুয়াল্লিশ হাজার মানুষ এই রোগে মারা যান। রোগ শনাক্তে আণবিক পর্যায়ের ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহও এই পরিকল্পনার অংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এইচআইভি সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সতেরো হাজার। গত বছর নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি মানুষ, যা এক বছরে দেশের সর্বোচ্চ সংক্রমণের রেকর্ড। একই সময়ে এইডসে মারা গেছেন দুই শতাধিক মানুষ। উল্লেখযোগ্যভাবে, দেশের সব ৬৪ জেলাতেই নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে মুন্সিগঞ্জে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালক জানিয়েছেন, বর্তমানে মাত্র ২৩টি জেলায় এইচআইভি পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে, তবে নতুন প্রকল্পের আওতায় সব জেলা সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, অসচেতনতা এবং সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে।
দেশে প্রায় দুই কোটি ৭২ লাখ মানুষ— অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ষোলো শতাংশ— ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে এই রোগ মূলত একটি এলাকাভিত্তিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে— গত বছর মোট রোগীর প্রায় নব্বই শতাংশই শনাক্ত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায়, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বান্দরবানে। প্রকল্পের লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো। এ জন্য মশারি বিতরণও কর্মসূচির অংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ক একজন অধ্যাপকের মতে, এই তিন রোগের জন্য একটি স্থায়ী সমাধান কাঠামো প্রয়োজন— নির্দিষ্ট মেয়াদের প্রকল্প বা কর্মসূচির বদলে বিদ্যমান সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে এই সেবাগুলো একীভূত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, প্রকল্প মেয়াদ শেষ হয়ে নতুন প্রকল্প অনুমোদনে দেরি হলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হতে পারে।
পুষ্টি সহায়তার অর্থ যথাযথ খাতে ব্যয় নিশ্চিত করাকেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তিনি, কারণ অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থ পুষ্টিকর খাবারের বদলে অন্য প্রয়োজনে ব্যয় হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রায় তিন দশক ধরে এই তিন রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মূলত উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে পরিচালিত হতো একটি নির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিকল্পনার মাধ্যমে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই তিন রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। বর্তমান সরকার এখন সেই পুরোনো পদ্ধতির পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকল্পের মাধ্যমে এই কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পাশাপাশি দাতা সংস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে সরকারি অর্থায়নের দিকে ঝুঁকছে।
বাস্তবায়নের সময় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতাও নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

