ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে এবং মা ইলিশের নিরাপদ প্রজননকে সুরক্ষিত রাখতে আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে। শুধু মাছ ধরা নয়, এই সময়ে ইলিশ পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ শুধু জেলেরাই নয়, আড়তদার, বরফকল মালিক, পরিবহনকারী থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত কেউই এই ২২ দিন ইলিশের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত থাকতে পারবেন না। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সভায় সভাপতিত্ব করেন।
এই ২২ দিন যেসব জেলে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকবেন, তাদের সরকারের ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই সহায়তা দেওয়া হয়। মূলত, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করাই এই সহায়তার উদ্দেশ্য, যাতে অর্থনৈতিক চাপে পড়ে তারা নিষেধাজ্ঞা ভেঙে মাছ ধরতে না যান। মন্ত্রী সভায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই সহায়তা যেন প্রকৃত জেলেদের কাছেই পৌঁছে, সে বিষয়ে তদারকি বাড়ানো হবে।
প্রশ্ন হলো, কেন বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে টানা ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ? এর পেছনে রয়েছে ইলিশের জৈবিক চক্র। অক্টোবর মাস ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ সময় মা ইলিশ ডিম ছাড়ে, আর সেই ডিম থেকে জন্ম নেয় নতুন প্রজন্মের ইলিশ। প্রজনন মৌসুমে যদি মা ইলিশ ধরা পড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইলিশ কমে যায়, যা সরাসরি উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে। গত কয়েক বছর ধরে ইলিশের আকার ছোট হয়ে আসা এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে এই কারণটিই অন্যতম। তাই মা ইলিশ সংরক্ষণের এই ২২ দিনকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আজ ২২ দিন মাছ না ধরলে আগামী বছর আরও বেশি ইলিশ পাওয়া যাবে।
ইলিশের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি সভায় বলেছেন, ইলিশের উৎপাদন দিন দিন কমে যাওয়ায় বিদেশ থেকে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে, এটি উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকার ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিল ৩৯ ইঞ্চিতে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ টনে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। ইলিশের চাহিদা মেটাতে সম্প্রতি ভারত থেকে ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি করতে হয়েছে। যশোর জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ১৯টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, ‘কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা চিহ্নিত করে সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেছেন, বরিশাল, চাঁদপুর ও ভোলাসহ ইলিশের প্রধান প্রজনন এলাকাগুলোতে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। জেলা প্রশাসন, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে হটস্পটগুলোতে অতিরিক্ত নৌযান ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হবে। শুধু নদী নয়, বরফকল, আড়ত ও বাজারেও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চাঁদপুর মোহনাসহ প্রজননক্ষেত্রে অবৈধ জাল অপসারণে কঠোর অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘কোনো অবস্থাতেই নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বা বাজারজাত করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
নিষেধাজ্ঞার সফলতার জন্য অবৈধ জাল বন্ধ করা অপরিহার্য বলে মনে করছেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেছেন, নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, জেলে প্রতিনিধিদেরও সচেতন করতে হবে যাতে তারা এসব জাল না কেনেন। কারণ, নিষিদ্ধ জাল দিয়ে অভিযান চালালে মা ইলিশসহ সব বয়সের ইলিশ ধরা পড়ে, যা প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেছেন, নদী দূষণ, কারেন্ট জাল ব্যবহার করে জাটকা নিধন, বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে জলসীমায় যথেষ্ট ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না বলে বাজারে ইলিশের সংকট তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রী ইলিশকে জাতীয় সম্পদ ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে এবং রক্ষা করতে সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে। সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. মীর হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসকবৃন্দ, র্যাব, কোস্ট গার্ড, বিমান বাহিনী, নৌ পুলিশ ও বিজিবির প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।
এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। আজ যদি মা ইলিশকে রক্ষা করা না যায়, তাহলে আগামী দিনে ইলিশের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞার সফলতা নির্ভর করছে কঠোর বাস্তবায়ন, জেলেদের সহায়তা এবং সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর।

