পাশের মর্গের উৎকট গন্ধে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শ্রেণিকক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মর্গের নির্গমন পাখার (এক্সজস্ট ফ্যান) মাধ্যমে দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস সরাসরি ক্লাসরুমে ঢুকছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, কেউ কেউ শ্রেণিকক্ষেই বমি করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ মর্গের নকশায় গোড়াতেই ভুল ছিল বলে স্বীকার করেছে। তবে স্থায়ী সমাধানের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহবুবুজ্জামান ভবনের শ্রেণিকক্ষগুলোতে প্রতিদিনই এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ক্লাসে ঢোকার উপায় থাকে না। মর্গের পচা গন্ধ সহ্য করতে না পেরে অনেকে ইতিমধ্যে বমি করেছেন। এই গন্ধের মধ্যে সারাক্ষণ ক্লাস করা খুবই কষ্টকর। তাঁর মতে, কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতায় স্বাস্থ্য ও পড়াশোনা, দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেনও একই কথা বলেছেন। তাঁর ভাষ্য, মর্গের উৎকট গন্ধে মাহবুবুজ্জামান ভবনের শ্রেণিকক্ষে থাকা যাচ্ছে না, স্বাভাবিকভাবে ক্লাস নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি নিজেও ওই গন্ধে বমি করেছেন। অনেক শিক্ষার্থীও বমি করেছেন এবং অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন এই দুর্গন্ধের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ভোগান্তির। বিষয়টি দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ডা. সোলায়মান কবীর মর্গের অবকাঠামোগত ত্রুটির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, গরম একটি কারণ, তবে অবকাঠামোতে অনেক ত্রুটিও আছে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল রাসায়নিক (কেমিক্যাল) আসবে এবং তা আসার পর পরিস্থিতি আরও কমে আসবে বলে তিনি জানান। নকশা নিয়ে তাঁর স্বীকারোক্তি ছিল আরও স্পষ্ট। তাঁর কথায়, শুরুতে যে কাঠামো করা হয়েছিল, সেটিই ভুল ছিল। এটি কখনোই রাস্তার পাশে হওয়ার কথা নয়। তবে তাঁরা কাজ করছেন এবং দ্রুত সমাধান হবে।
কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগে সন্তুষ্ট নন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা। তাঁরা অবিলম্বে মর্গের বাতাস বের হওয়ার ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো বা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্গন্ধের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ চেয়েছেন।
এই ঘটনার মূল সমস্যা বুঝতে দুটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান দেখা দরকার। একটি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আরেকটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। দুটি একেবারে পাশাপাশি। মর্গ মেডিকেল কলেজের, কিন্তু তার বাতাস গিয়ে পড়ছে অন্য প্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুমে। ফলে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন এমন মানুষেরা, যাঁদের সমস্যা সমাধানের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। শেকৃবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মর্গের কাঠামো বদলাতে পারেন না, আবার মেডিকেল কলেজের ওপর তাঁদের কোনো প্রশাসনিক কর্তৃত্বও নেই। এমন অবস্থায় সমাধান নির্ভর করে দুই কর্তৃপক্ষের সমন্বয় ও সদিচ্ছার ওপর। প্রতিবেদনে শেকৃবি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে মেডিকেল কলেজকে চিঠি দিয়েছে কি না, কিংবা উপাচার্যের কোনো বক্তব্য আছে কি না, তা জানা যায় না। সহকারী প্রক্টর কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ চেয়েছেন।
ভাইস প্রিন্সিপালের বক্তব্যে একটি লক্ষণীয় বিষয় আছে। তিনি গরমকে একটি কারণ বলেছেন। গরমে দুর্গন্ধ বাড়া স্বাভাবিক, কারণ তাপমাত্রা বাড়লে জৈব পদার্থ দ্রুত পচে এবং গন্ধ বেশি ছড়ায়। কিন্তু এর মানে সমস্যাটি মৌসুমি নয়, বরং গরমের সময় আরও প্রকট হয় মাত্র। নকশাগত ত্রুটি থাকলে অন্য সময়েও গন্ধ থাকবে, কেবল তীব্রতা কম হবে। তাই গরমকে কারণ হিসেবে সামনে আনা আংশিক ব্যাখ্যা হতে পারে, পুরো ব্যাখ্যা নয়। তিনি নিজেও মূল কারণ হিসেবে অবকাঠামোর ত্রুটিকেই স্বীকার করেছেন।
আরেকটি প্রশ্ন সমাধানের ধরন নিয়ে। কর্তৃপক্ষ বলছে, রাসায়নিক আসবে এবং তাতে পরিস্থিতি কমবে। এটি ভাষাগতভাবেই সাময়িক ব্যবস্থা। রাসায়নিক গন্ধ কমাতে পারে, কিন্তু উৎস দূর করে না। আর সেটি কী রাসায়নিক, কত দিন কাজ করবে এবং তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ কি না, প্রতিবেদনে তার কিছুই বলা হয়নি। ক্লাসরুমের কাছে যে বাতাস ঢুকছে, তাতে রাসায়নিক মেশানো হলে সেটির প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। স্থায়ী সমাধানের মধ্যে থাকতে পারে নির্গমন পথ সরিয়ে দেওয়া, ফিল্টার বসানো বা বায়ু চলাচলের কাঠামো নতুন করে সাজানো। কর্তৃপক্ষ এসবের কোনোটির কথা স্পষ্ট করে বলেনি, শুধু বলেছে “দ্রুতই সমাধান হবে”। কবে নাগাদ, সেই সময়সীমা নেই।
স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটিও আলাদা করে দেখা দরকার। বমি হওয়া বা অসুস্থ বোধ করা তীব্র গন্ধের সাধারণ প্রতিক্রিয়া। তবে বারবার ও দীর্ঘ সময় এমন বাতাসে থাকলে কারও শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা বা অন্য অস্বস্তি বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে কতজন অসুস্থ হয়েছেন, কেউ চিকিৎসা নিয়েছেন কি না বা কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে কি না, তার তথ্য নেই। সংখ্যা না থাকায় সমস্যার ব্যাপ্তি মাপা যাচ্ছে না। অভিযোগগুলোও মূলত এক শিক্ষার্থী ও সহকারী প্রক্টরের বক্তব্যনির্ভর। ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা বুঝতে স্বাধীন স্বাস্থ্য বা পরিবেশগত মূল্যায়ন লাগবে। এ বিষয়ে কোনো বিশেষজ্ঞের মত প্রতিবেদনে আসেনি।
পাঠদানের ক্ষতির প্রশ্নও আছে। মাহবুবুজ্জামান ভবনের কোন কোন বিভাগের ক্লাস কতটা ব্যাহত হচ্ছে, ক্লাস স্থানান্তর হয়েছে কি না বা পরীক্ষার সূচিতে প্রভাব পড়েছে কি না, প্রতিবেদনে সে তথ্য নেই। তবে সহকারী প্রক্টরের বক্তব্য থেকে ধারণা মেলে, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে স্বাভাবিকভাবে ক্লাস নেওয়া যাচ্ছে না। ক্লাসের মান ও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব ফলাফলে পড়তে পারে। ভাড়া বা বিকল্প কক্ষে ক্লাস সরানোর মতো অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও অজানা।
জনস্বাস্থ্য ও নগর পরিকল্পনার বড় প্রশ্নও এখানে উঠে আসে। ভাইস প্রিন্সিপালের নিজের স্বীকারোক্তি, এমন কাঠামো রাস্তার পাশে হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান নিজেই মানছে, স্থান নির্বাচনেই সমস্যা ছিল। আবাসিক ও শিক্ষা এলাকার কাছে এমন স্থাপনা করার সময় বাতাস চলাচল, গন্ধ নিয়ন্ত্রণ ও আশপাশের ওপর প্রভাব বিবেচনা করা উচিত ছিল। কে অনুমোদন দিয়েছিলেন, কোন মানদণ্ডে, আর পরিবেশগত বা স্বাস্থ্যগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কি না, প্রতিবেদনে সে তথ্য নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর পেলে ভবিষ্যতে একই ভুল এড়ানো সহজ হতো।
শিক্ষার্থীদের দাবিও লক্ষ করার মতো। তাঁরা নির্গমন ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো বা বন্ধ করার কথা বলছেন। বন্ধ করা বাস্তবে সহজ নয়। কারণ মর্গে বাতাস চলাচল না থাকলে ভেতরের পরিবেশ আরও খারাপ হবে এবং কর্মীদের ঝুঁকি বাড়বে। তাই বাতাসের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া, উঁচু চিমনি বসানো বা ফিল্টার লাগানোর মতো কারিগরি বিকল্পই বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। এটি অবশ্য আমার নিজের ধারণা। প্রতিবেদনে কোনো প্রকৌশলী বা বিশেষজ্ঞের মত নেই। তবে দাবির মূল কথা স্পষ্ট: স্থায়ী সমাধান চাই, সাময়িক প্রলেপ নয়।
সব মিলিয়ে ঘটনাটি একটি সহজ কিন্তু গুরুতর সমস্যার উদাহরণ। এক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত ত্রুটির খেসারত দিচ্ছেন আরেক প্রতিষ্ঠানের মানুষ। কর্তৃপক্ষ ত্রুটি স্বীকার করেছে, এটি ইতিবাচক। কিন্তু স্বীকারোক্তি সমাধান নয়। সামনে তিনটি বিষয় নজরে রাখতে হবে। প্রথমত, রাসায়নিক ব্যবহারের পর সত্যিই গন্ধ কমছে কি না। দ্বিতীয়ত, মর্গের নির্গমন ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বদলানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা ঘোষণা হয় কি না। তৃতীয়ত, দুই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বসে সমস্যার সমাধান করে কি না। এই তিনটি না হলে সমস্যা ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে, আর ভুক্তভোগী থাকবেন সেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই।

