হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৯ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০১ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৯৯৮ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের ও একজন সিলেট বিভাগের। এই সময়ে নতুন করে উপসর্গ দেখা দিয়েছে ১ হাজার ২১৪ জনের শরীরে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর মোট সংখ্যা এখন ১ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৫। একই ২৪ ঘণ্টায় ৯৬ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। মোট শনাক্ত রোগী ২১ হাজার ৩০৮ জন।
হাসপাতালের হিসাবে, উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৯ জন। এঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৩৩ জন। নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪০৪, চট্টগ্রামে ২৭৫, সিলেটে ১৬৪, বরিশালে ১৩০, খুলনায় ৭৮, ময়মনসিংহে ৬৮, রাজশাহীতে ২৮ ও রংপুরে ১২ জন।
বিভাগওয়ারি মৃত্যুর হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণ গেছে ঢাকা বিভাগে, ৪৪৮ জনের। এরপর সিলেটে ১৭৬, রাজশাহীতে ৯৩, চট্টগ্রামে ৮৩, ময়মনসিংহে ৭৯, বরিশালে ৬০, খুলনায় ৪৪ ও রংপুরে ১৫ জন।
সংখ্যাগুলো একসঙ্গে দেখলে রোগের চেহারা আরও স্পষ্ট হয়। ১৫ মার্চ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৯৮ দিনে গড়ে প্রতিদিন উপসর্গ দেখা দিয়েছে প্রায় ৯৫০ জনের, আর মারা গেছেন গড়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার চিত্র এই গড়ের কাছাকাছি। নতুন আক্রান্ত ১ হাজার ২১৪ জন গড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি, কিন্তু তিনটি মৃত্যু গড়ের চেয়ে কম। এক দিনের সংখ্যা থেকে প্রবণতা বোঝা যায় না, তবে মহামারির প্রায় সাত মাসের মাথায়ও দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের ওপরে থাকা বলছে, সংক্রমণ এখনো থামেনি।
মৃত্যুহার নিয়েও কিছু হিসাব করা যায়। মোট প্রাণহানি ও মোট উপসর্গী রোগীর অনুপাত প্রায় দশমিক ৫৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে ০.৬ জনের কাছাকাছি। শুধু নিশ্চিত হামের রোগীদের হিসাবে এই হার প্রায় দশমিক ৪৭ শতাংশ। এই হার শিশুদের জন্য বিপজ্জনক একটি রোগের পরিপ্রেক্ষিতে কম মনে হতে পারে। তবে প্রায় ১.৯ লাখ রোগীর কারণে মোট মৃত্যু হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ছোট হারও বিশাল সংখ্যার ওপর প্রয়োগ হলে বড় ক্ষতি করে।
আরেকটি লক্ষণীয় দিক নিশ্চিত ও উপসর্গী মৃত্যুর অনুপাত। মোট ১ হাজার ৯৯ মৃত্যুর মধ্যে ৯৯৮টি, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ, হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু। প্রতিবেদনে বলা নেই, এসব রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না। একই সঙ্গে মোট উপসর্গী রোগীর মাত্র প্রায় ১১ শতাংশের (২১ হাজার ৩০৮ জন) হাম নিশ্চিত হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২১৪ জনের মধ্যে নিশ্চিত হয়েছেন ৯৬ জন, যা প্রায় ৮ শতাংশ। অর্থাৎ বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই কেবল উপসর্গ দেখে হিসাব রাখা হচ্ছে। পরীক্ষা কম হওয়ার কারণে হতে পারে, আবার নমুনা পরীক্ষার সীমিত সক্ষমতার কারণেও হতে পারে। প্রতিবেদনে কারণ বলা হয়নি। তবে এর ফলে সঠিক রোগ নির্ণয় ও প্রকৃত মৃত্যুর কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়।
চিকিৎসার দিকে তাকালে চিত্র তুলনামূলক আশাব্যঞ্জক। মোট রোগীর প্রায় ৮৮ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি রোগীদের ৯৬ শতাংশের মতো সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ভর্তি ও ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৬ হাজার ৭৩৬ জন। এই সংখ্যার মধ্যে এখনো চিকিৎসাধীন রোগী, মৃত্যুবরণকারী এবং অন্য কারণে ছাড়া পাওয়া রোগী থাকতে পারে। প্রতিবেদনে এর বিভাজন নেই, তাই কতজন এখনো হাসপাতালে আছেন তা বলা যাচ্ছে না।
বিভাগওয়ারি চিত্রে কয়েকটি বিষয় নজরে পড়ে। ঢাকা বিভাগে মৃত্যু প্রায় ৪৫ শতাংশ। ঢাকা ও সিলেট মিলিয়ে মৃত্যুর প্রায় ৬২ শতাংশ। দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বিভাগে বেশি মৃত্যু হওয়া প্রত্যাশিত। কিন্তু সিলেট জনসংখ্যায় ঢাকার তুলনায় অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয় স্থানে আছে। প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বা টিকাদানের হারের তথ্য না থাকায় এর কারণ বলা যাচ্ছে না। সংখ্যাটি ইঙ্গিত দেয়, সিলেটে টিকার আওতা বা চিকিৎসাসেবার সুযোগ নিয়ে আলাদা করে খোঁজ নেওয়া দরকার হতে পারে। রংপুরে মৃত্যু সবচেয়ে কম, মাত্র ১৫, যা মোটের প্রায় ১.৫ শতাংশ।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার ভর্তির হিসাবে চট্টগ্রামের অবস্থান বিশেষভাবে চোখে পড়ে। মোট মৃত্যুর তালিকায় চট্টগ্রাম চতুর্থ, ৮৩ জন নিয়ে। অথচ নতুন ভর্তির হিসাবে দ্বিতীয়, ২৭৫ জন। ওই ২৪ ঘণ্টার তিনটি মৃত্যুর দুটিও চট্টগ্রামের। এটি ইঙ্গিত দিতে পারে, চট্টগ্রামে সংক্রমণ এখন তুলনামূলক সক্রিয়। তবে এক দিনের সংখ্যা থেকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। ধারাবাহিক কয়েক দিনের তথ্য মিলিয়ে দেখা দরকার। ওই দিন নতুন ভর্তির মোট সংখ্যা ১ হাজার ১৫৯, যার প্রায় ৩৫ শতাংশ ঢাকায় ও প্রায় ২৪ শতাংশ চট্টগ্রামে।
প্রতিবেদনে কিছু সংখ্যার অসংগতি আছে, যা যাচাই দরকার। এক জায়গায় মোট ভর্তির সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৯ বলা হয়েছে। অন্য জায়গায় “২৪ ঘণ্টায় ভর্তি” হিসেবে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫২৪ লেখা আছে, যা আসলে মোট ভর্তির আরেকটি অঙ্ক বলেই মনে হয়। দুটির ব্যবধান ৫৫। আবার বিভাগওয়ারি নতুন ভর্তির যোগফল ১ হাজার ১৫৯, যা এই অসংগতির ব্যাখ্যা দেয় না। বিভাগওয়ারি মৃত্যুর সংখ্যাগুলো যোগ করলে হয় ৯৯৮, অর্থাৎ শুধু উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা, নিশ্চিত মৃত্যুর ১০১ এতে ধরা হয়নি। প্রতিবেদনে অবশ্য এটিকে “মোট প্রাণহানির” হিসাব বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিভাগওয়ারি চিত্রে নিশ্চিত হামে মৃত্যুর ভাগ আলাদা করে দেখানো নেই।
সব মিলিয়ে হামের প্রকোপ প্রায় সাত মাস পরও কমার লক্ষণ স্পষ্ট নয়। দৈনিক আক্রান্ত এখনো হাজারের ওপরে এবং মৃত্যু প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। বেশির ভাগ রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছেন, এটি ইতিবাচক। কিন্তু পরীক্ষার সীমিত পরিসর, বিভাগভেদে মৃত্যুর তারতম্য ও তথ্যের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। সামনে কয়েকটি বিষয় নজরে রাখতে হবে। দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা কমতির দিকে যায় কি না, নিশ্চিত শনাক্তের হার বাড়ে কি না, এবং চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো বিভাগে সংক্রমণ কোন দিকে যায়।

