সময়মতো ওষুধ খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়া আমাদের অনেকের নিত্যদিনের সমস্যা। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা আরও বেশি। অনেক পরিবারেই সন্তানদের বারবার তাগাদা দিতে হয়, কখনো কখনো চেঁচামেচিও করতে হয়। এই সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে অটোমেটিক পিল ডিসপেনসার। ছোট এই যন্ত্র ওষুধ খাওয়ার সময় হলেই অ্যালার্ম বাজিয়ে বা আলো জ্বালিয়ে মনে করিয়ে দেয়। কিছু যন্ত্র আরও এক ধাপ এগিয়ে। রোগী ওষুধ না নিলে নির্দিষ্ট নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে পরিবারকে জানিয়েও দেয়।
যন্ত্রটির ভেতরে থাকে অনেক ঘরে ভাগ করা একটি গোলাকার ট্রে। রোগীর ওষুধ খাওয়ার সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিটি ঘরে নির্দিষ্ট সময়ের ওষুধ রাখতে হয়। এ কাজে পরিবারের সদস্য, পরিচর্যাকারী কিংবা ফার্মাসিস্টের সাহায্য নেওয়া যায়।
ওষুধ সাজানো হয়ে গেলে যন্ত্রে খাওয়ার সময় ও অ্যালার্ম ঠিক করে দিতে হয়। নির্ধারিত সময় এলে অ্যালার্ম বাজে ও আলো জ্বলে ওঠে। একই সঙ্গে ভেতরের ট্রে ঘুরে ওই সময়ের ওষুধের ঘরটি ঢাকনার খোলা অংশের সামনে চলে আসে। ব্যবহারকারী যন্ত্রটি কাত করলে ওষুধ হাতের তালুতে বা ছোট কোনো পাত্রে পড়ে। ওষুধ বের হলে সাধারণত অ্যালার্ম বন্ধ হয়ে যায়। ওষুধ খাওয়ার পর যন্ত্রটি আগের অবস্থায় রেখে দিতে হয়।
যন্ত্রের ঢাকনা লক করা থাকায় নির্ধারিত সময়ের আগে অন্য ওষুধ বের করা যায় না। ফলে ভুল করে বাড়তি ওষুধ খেয়ে ফেলার ঝুঁকি কমে। কেউ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওষুধ না নিলে আগে থেকে ঠিক করা নম্বরে, অর্থাৎ পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের ফোনে, একটি খুদে বার্তা চলে যায়। সেই বার্তা দেখে তিনি ফোন করে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে পারেন।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ও অনলাইনে এ ধরনের যন্ত্র পাওয়া যায়। ফিচার অনুযায়ী দাম ওঠানামা করে। সাধারণত ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকার মধ্যে এটি কেনা সম্ভব।
এই যন্ত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা কয়েকটি দিক থেকে বোঝা যায়। প্রথমত, নিয়মিত ওষুধ খাওয়া অনেক দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো অবস্থায় ওষুধ বাদ পড়লে রোগের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হতে পারে। সময়মতো মনে করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা তাই সরাসরি চিকিৎসার ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
দ্বিতীয়ত, যাঁরা বয়স্ক বাবা-মা থেকে দূরে থাকেন, তাঁদের জন্য এটি বড় স্বস্তির বিষয়। কর্মসূত্রে শহরে বা বিদেশে থাকা সন্তানেরা খুদে বার্তার মাধ্যমে জানতে পারবেন, ওষুধ খাওয়া হয়েছে কি না। এতে বারবার ফোন করে জিজ্ঞেস করার চাপ কমে, পারিবারিক সম্পর্কেও অহেতুক বিরক্তি তৈরি হয় না।
তৃতীয়ত, একসঙ্গে একাধিক ওষুধ খাওয়া রোগীদের জন্য এটি সুবিধাজনক। কোন সময়ে কোন ওষুধ খেতে হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকে না। লকের ব্যবস্থা থাকায় ভুল ওষুধ বা দ্বিতীয়বার একই ওষুধ খাওয়ার আশঙ্কাও কমে।
তবে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। যন্ত্র যত আধুনিকই হোক, ট্রেতে ওষুধ সঠিকভাবে সাজানোর দায়িত্ব মানুষেরই। ভুল ঘরে ওষুধ রাখলে যন্ত্র সেই ভুলই বহাল রাখবে। তাই ওষুধ সাজানোর সময় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র মিলিয়ে নেওয়া এবং সম্ভব হলে ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো। এ ছাড়া সব ওষুধ এই ধরনের ট্রেতে রাখা উপযুক্ত নয়। আর্দ্রতা বা আলোয় নষ্ট হয়ে যায় এমন ওষুধ কীভাবে রাখতে হবে, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
কেনার আগে যন্ত্রটির ধরন ভালোভাবে দেখে নেওয়াও জরুরি। বার্তা পাঠানোর সুবিধা সব মডেলে থাকে না। ব্যাটারি কতক্ষণ চলে, অ্যালার্মের শব্দ বয়স্কদের শোনার মতো জোরালো কি না এবং ব্যবহার সহজ কি না, তা যাচাই করা দরকার। বিক্রয়োত্তর সেবা ও ওয়ারেন্টির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা ভালো।
সব মিলিয়ে, ছোট এই যন্ত্র বয়স্কদের স্বাধীনভাবে ওষুধ খাওয়ার সুযোগ দেয় এবং পরিবারকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখে। তবে এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়, বরং নিয়ম মেনে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার একটি সহায়ক উপকরণ মাত্র।

