সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর নিশ্চিত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৮ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ২২১ জনের মধ্যে উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে, যাঁদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত ১২৮ জন। সংক্রমণ কমার প্রবণতা থাকলেও রোগটি এখনো প্রতিদিন নতুন রোগী ও প্রাণহানির কারণ হয়ে আছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ২২১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এঁদের মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে ১২৮ জনের।
সামগ্রিক চিত্রে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩১ জনে। এ সময়ে নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৫২০ জন।
অধিদপ্তরের সূত্র আরও জানায়, ১৫ মার্চ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮০০ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৭৩ জন। অর্থাৎ হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৯৬ শতাংশ সুস্থ হয়েছেন।
এই তথ্য থেকে কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, মৃত্যুর সংখ্যা। ছয় মাসের কিছু বেশি সময়ে ১ হাজার ১০৮ জনের প্রাণহানি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হামের টিকা কার্যকর ও সহজলভ্য হওয়া সত্ত্বেও এত মৃত্যু টিকাদান কর্মসূচিতে ফাঁক থাকার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে কোন এলাকা ও বয়সের শিশুরা টিকার বাইরে ছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, উপসর্গযুক্ত ও নিশ্চিত রোগীর বড় ব্যবধান। প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার উপসর্গযুক্ত রোগীর বিপরীতে নিশ্চিত রোগী ২১ হাজার ৫২০ জন। অর্থাৎ উপসর্গযুক্তদের মধ্যে মাত্র প্রায় ১১ শতাংশের ক্ষেত্রে ল্যাব পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে সব রোগীর নমুনা পরীক্ষা না হওয়া। তাই প্রকৃত সংক্রমণের চিত্র নিশ্চিত সংখ্যার চেয়ে বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরীক্ষার পরিসর বাড়ানো দরকার।
তৃতীয়ত, দৈনিক সংক্রমণের ধারা। প্রতিদিন এখনো হাজারের বেশি উপসর্গযুক্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বর্ষা-পরবর্তী সময়ে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে বলে সতর্কতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
চতুর্থত, চিকিৎসা ও সুস্থতার হার আশাব্যঞ্জক হলেও তা মৃত্যুঝুঁকিকে ছোট করে না। হাসপাতালে আসা বেশির ভাগ রোগী সুস্থ হয়েছেন, এটি ইতিবাচক। কিন্তু যেসব শিশুর অবস্থা জটিল হয়ে পড়ে, তাদের দ্রুত হাসপাতালে আনা ও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। নিউমোনিয়া ও পুষ্টিহীনতার মতো জটিলতা মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
পঞ্চমত, অভিভাবকদের সচেতনতা। শিশুর জ্বর, গায়ে র্যাশ, কাশি বা চোখ লাল হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা এবং টিকা বাকি থাকলে দ্রুত তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে হামের এই প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিচ্ছে, টিকাদানের ধারাবাহিকতা ও রোগ নজরদারির শক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় না নামা পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগ ও অভিভাবক, সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

