সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪৫। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই মারা গেছেন ১৪৮ জন, যা চলতি বছরের কোনো এক মাসের সর্বোচ্চ। অর্থাৎ বছরের মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ঘটেছে একটি মাসে, যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত। বিশেষজ্ঞেরা অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১৮৯ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২১০ জন এবং ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ৩২০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বিভাগওয়ারি হিসাবে বরিশালে ভর্তি হয়েছেন ২১২ জন, চট্টগ্রামে ৩৪৩, খুলনায় ২৪৮, ময়মনসিংহে ১০২, রাজশাহীতে ২১১, রংপুরে ৯৯ এবং সিলেটে ১৪ জন।
একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ হাজার ৮৮২ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন, যাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৭৩ হাজার ৮৯০ জন। এই হিসাবে দেখা যায়, সংক্রমণ এখন শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহীর মতো বিভাগেও দৈনিক ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা প্রস্তুতির উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিতভাবে নেওয়ার প্রয়োজন স্পষ্ট।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, তাঁদের পূর্বাভাসভিত্তিক মডেল অনুযায়ী অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং সেপ্টেম্বরের চেয়ে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়বে। তিনি আরও বলেন, এডিস মশা শুধু দিনে কামড়ায়, এই ধারণা সঠিক নয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি রাতেও কামড়াতে পারে। শীতে মশার ঘনত্ব কমলেও সতর্কতা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মত দেন তিনি। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। এই বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রচলিত ধারণার সংশোধন। যাঁরা কেবল দিনের বেলায় সুরক্ষা নিচ্ছেন, রাতেও তাঁদের ঝুঁকি থেকে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শ, কোথাও যেন পানি জমে না থাকে। ডাবের খোসা, ফুলের টব বা পলিথিনে জমে থাকা পানিও এডিসের প্রজননস্থল হতে পারে। রাতে মশারি ব্যবহার এবং শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরারও পরামর্শ দেন তিনি। এসব পরামর্শ সহজ হলেও সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর, তবে তা তখনই ফল দেবে, যখন পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে মানা হবে। কারণ একটি বাড়ি পরিষ্কার থাকলেও পাশের বাড়িতে পানি জমে থাকলে মশার বিস্তার থামে না।
চট্টগ্রামে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত তিন বছরের সেপ্টেম্বরের তথ্য তুলনা করলে দেখা যায়, এ বছর মৃত্যু ও আক্রান্ত দুটিই আগের দুই বছরের চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সেখানে মারা গিয়েছিলেন চারজন, আক্রান্ত হয়েছিলেন ৯৩৫ জন। ২০২৪ সালের একই মাসে মৃত্যু ১১ জন, আক্রান্ত ৯০৭ জন। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে মৃত্যু ১৬ জন এবং আক্রান্ত ২ হাজার ৪৩০ জন। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় আড়াই গুণ, মৃত্যু চার গুণ। এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, সংক্রমণের তীব্রতা বছর বছর কমছে না, বরং কোনো কোনো এলাকায় বাড়ছে। ফলে আগের বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নেওয়া প্রস্তুতি এ বছর যথেষ্ট না-ও হতে পারে।
ডেঙ্গুর ভয়াবহতার করুণ উদাহরণ চট্টগ্রামের সাত বছর বয়সী অনুশ্রী দাশ। নগরের পাহাড়তলীর রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর ১৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ জ্বর আসে। ১৮ সেপ্টেম্বর পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে সেদিনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো যায়নি। অনুশ্রীর বাবা সুবল দাশ বলেন, ডেঙ্গুতে তাঁর সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। অনুশ্রী ছিল তাঁদের একমাত্র মেয়ে। তাকে বাঁচাতে সাধ্যমতো সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। মেয়ে হারানোর ব্যথা সহ্য করার মতো নয়। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে মেয়েটিকে এভাবে অকালে হারাতে হতো না বলে তিনি মনে করেন। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ডেঙ্গুর পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একেকটি পরিবারের ক্ষতি রয়েছে। সংক্রমণ শনাক্তের পর কয়েক দিনের মধ্যেই শিশুর অবস্থা জটিল হতে পারে। তাই জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও বাড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন জানান, রোগী বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু ওয়ার্ডে জায়গা হচ্ছে না। অনেক রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুর ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে। শিশুসহ রেকর্ডসংখ্যক মানুষ এ মাসে মারা গেছেন। শিগগির মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন। মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা দেওয়ার চিত্র থেকে বোঝা যায়, হাসপাতালের শয্যা ও জনবলের ওপর চাপ ইতিমধ্যে সীমা ছাড়িয়েছে। সংক্রমণ আরও বাড়লে গুরুতর রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে লার্ভা ধ্বংস, ওষুধ ছিটানো ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে প্রজননস্থল ধ্বংসে শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এখানে দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশনের অভিযান জরুরি, কিন্তু বাসাবাড়ি, নির্মাণস্থল ও খালি জায়গায় পানি জমতে না দেওয়ার দায়িত্ব নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানেরও। তবে সেই সচেতনতা তৈরিতে নিয়মিত প্রচার ও তদারকিও প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের রেকর্ড মৃত্যু অক্টোবরের জন্য সতর্কসংকেত। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস সত্য হলে সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও বাড়বে, আর শীতের আগে এই সময়টিই মশা নিয়ন্ত্রণের শেষ সুযোগ। এ জন্য সিটি করপোরেশনগুলোর নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অভিযান, হাসপাতালে অতিরিক্ত শয্যা ও জনবলের প্রস্তুতি এবং নাগরিক পর্যায়ে পানি জমতে না দেওয়ার সচেতনতা, এই তিনটি বিষয়ে একযোগে কাজ করা জরুরি।

