সারা দেশে হাম উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত নিশ্চিত হাম ও হাম উপসর্গে মৃত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১০ জনে। আজ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সাড়ে ছয় মাসে প্রাণহানি এক হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া ইঙ্গিত দেয়, প্রকোপ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং এর বড় অংশের শিকার শিশুরা।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৩২ জন। ১৫ মার্চ থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হামরোগী ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৩ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হামরোগী শনাক্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৬০২ জন, যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছেন ৮২ জন। দৈনিক এক হাজারের বেশি সন্দেহজনক রোগী মানে সংক্রমণ এখনো উচ্চ হারে চলছে। তবে মোট সন্দেহজনক রোগীর মধ্যে নিশ্চিত হয়েছেন প্রায় ১১ শতাংশ। এর অর্থ এই নয় যে বাকিরা হামে আক্রান্ত নন। সব সন্দেহজনক রোগীর নমুনা পরীক্ষা হয় না, ফলে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা প্রকৃত সংক্রমণের চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পরীক্ষার পরিধি কতটা এবং কত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, বিজ্ঞপ্তিতে সে তথ্য নেই।
মৃত্যুর হিসাবে দুটি ভাগ আছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মারা গেছে ১ হাজার ৯ শিশু এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০১ জনের, যোগফল ১ হাজার ১১০। গত ২৪ ঘণ্টার দুটি মৃত্যুই সন্দেহজনক হামে, নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি। এখানে লক্ষণীয়, মৃত্যুর প্রায় ৯১ শতাংশ সন্দেহজনক ক্যাটাগরিতে, যাদের হাম নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়নি। এর কারণ হতে পারে, গুরুতর অসুস্থ শিশুর মৃত্যুর আগে নমুনা সংগ্রহ বা পরীক্ষার সময় পাওয়া যায়নি, কিংবা পরীক্ষার ফল আসার আগেই মৃত্যু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় না হলে হামের সত্যিকারের ক্ষতির চিত্র অস্পষ্ট থেকে যায়।
সামগ্রিক সংখ্যাকে অনুপাতের দিক থেকে দেখলে সন্দেহজনক রোগীর তুলনায় মৃত্যুহার প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি এক হাজার সন্দেহজনক রোগীর মধ্যে ছয়জনের মতো মারা গেছে। নিশ্চিত রোগীর ক্ষেত্রে মৃত্যুহার প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। হার ছোট দেখালেও এত বড় সংখ্যক রোগীর কারণে প্রাণহানি এক হাজারের বেশি, আর হাম টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ বলে প্রতিটি মৃত্যুই প্রশ্ন তোলে। কোন বয়সের, কোন অঞ্চলের এবং টিকা নেওয়া ছিল কি না, তা জানা না গেলে ঝুঁকির মূল জায়গা শনাক্ত করা কঠিন। বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য নেই।
চিকিৎসার চিত্রে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৭ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৩ জন। ভর্তি ও ছাড়পত্রের ব্যবধান প্রায় ৬ হাজার ৯০০। এর একটি অংশ এখনো চিকিৎসাধীন থাকতে পারে, আর কিছু রোগী মারা গেছেন বা অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়েছেন, তবে বিজ্ঞপ্তিতে এই ব্যবধানের হিসাব দেওয়া হয়নি। ভর্তি রোগী ও মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যার তফাত থেকে বোঝা যায়, প্রায় ২২ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাড়িতে বা অন্যত্র চিকিৎসা নিয়েছেন। এমন রোগীর অবস্থা অবনতি হলে দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে, যা মৃত্যুর একটি কারণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে হামের এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সতর্কসংকেত। দৈনিক এক হাজারের বেশি সন্দেহজনক রোগী এখনো শনাক্ত হচ্ছে, আর মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এ অবস্থায় টিকাদান কর্মসূচির আওতা ও বাদ পড়া শিশুদের হালনাগাদ তথ্য, মৃত্যুর কারণ ও বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা প্রকাশ করা জরুরি। বিজ্ঞপ্তিতে সংক্রমণ রোধে নতুন কোনো পদক্ষেপ বা টিকা অভিযানের কথা উল্লেখ নেই। অভিভাবকদের জন্য সতর্কতার বার্তা হলো, শিশুর জ্বর, গায়ে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং টিকা না নিয়ে থাকলে দ্রুত তা সম্পন্ন করা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরবর্তী দৈনিক বিজ্ঞপ্তিতে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে কি না, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

