সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি থাকলেও দিনের বড় একটি সময় তা অব্যবহৃত পড়ে থাকছে। দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে বহির্বিভাগের রোগীদের নিয়মিত পরীক্ষা দুপুর ২টায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দুপুরের পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে, যেখানে একই পরীক্ষায় কয়েক গুণ বেশি খরচ হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, জনবলের সংকটই এর প্রধান বাধা। বিশেষজ্ঞেরা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) বিকেলের শিফট চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।
বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত ডায়াগনস্টিক সেবা চালু থাকে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত, অর্থাৎ মাত্র ছয় ঘণ্টা। অনেক হাসপাতালে দুপুর ১টার পর পরীক্ষার ফি জমা নেওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা একই দিনে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা করাতে পারেন না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) ভাষ্য, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত ডায়াগনস্টিক সেবা দুই শিফটে চালু করা যাচ্ছে না।
গত সপ্তাহে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা নিতে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলেন মহাখালীর বাসিন্দা মো. ওমর ফারুখ। চিকিৎসক তাঁকে সিবিসি, ইসিজি ও এক্স-রে করানোর পরামর্শ দেন। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি ইসিজি করাতে পারলেও দুপুর পৌনে ২টার দিকে সিবিসি করাতে গিয়ে জানতে পারেন, সেদিন আর পরীক্ষা হবে না।
ওমর ফারুখ টিবিএসকে বলেন, সিবিসি ওই দিন করা না গেলে পরদিন আবার আসতে হবে, কিন্তু মহাখালী থেকে একটি পরীক্ষার জন্য আবার আসা কঠিন। তাঁর ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু দুপুর ২টায় পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে বাধ্য হয়ে বেশি খরচে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়।
শুধু সোহরাওয়ার্দী নয়, দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালেই দুপুরের পর বহির্বিভাগের রোগীদের নিয়মিত ডায়াগনস্টিক সেবা বন্ধ থাকে। তবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটসহ যেসব হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার সেন্টার আছে, সেখানে জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, সিসিইউ ও ভর্তি রোগীদের জন্য দুপুরের পরও এই সেবা চালু থাকে। বহির্বিভাগের রোগীরা সাধারণত সেই সুবিধা পান না।
আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারে সকালে রোগীর ব্যাপক চাপ থাকলেও দুপুরের পর প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। সেখানে বিকেলে ল্যাবরেটরি সেবা চালুর উদ্যোগের কথা থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।
সরকারি ও বেসরকারি পরীক্ষার খরচে বড় ব্যবধান আছে। সরকারি হাসপাতালে ইসিজি করাতে লাগে ৮০ টাকা, বেসরকারিতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। আলট্রাসনোগ্রাফি সরকারি হাসপাতালে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা হলেও বেসরকারিতে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এইচবিএওয়ানসি পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে ৩০০ টাকায় করা গেলেও বেসরকারিতে খরচ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘ক্যাটাস্ট্রফিক হেলথ শক অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ: ইনসাইটস ফ্রম এইচআইইএস-২০২২’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে দেশে চিকিৎসার মোট খরচের ৭৩ শতাংশই রোগীদের নিজের পকেট থেকে মেটাতে হয়েছে। ২০২০ সালে এই হার ছিল ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ। পরিবারগুলোর এই নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যয়ের ২৭ দশমিক ৫২ শতাংশই যায় রোগ নির্ণয়ে, অর্থাৎ ডায়াগনস্টিক সেবায়।
সংকটের বড় কারণ জনবলের ঘাটতি। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘ব্রিজিং গ্যাপস ইন বাংলাদেশস পাবলিক হেলথ সিস্টেম’ গবেষণা বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত পদ ৬ হাজার ৪০৬টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৮৯২ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য।
বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সেলিম মোল্লা টিবিএসকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো থাকলেও তা চালানোর মতো জনবল নেই। তাঁর ভাষ্য, অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পদ শূন্য, আর বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত লোক নেই। সারা দেশে হাজার হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ খালি, অনেক জায়গায় যন্ত্র আছে কিন্তু চালানোর লোক নেই। সেলিম আরও বলেন, রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রোবায়োলজিসহ অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দরকার।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, দুপুরের পর ডায়াগনস্টিক সেবা চালুর পরিকল্পনা সরকারের আছে। তবে প্রধান বাধা জনবল সংকট। তিনি টিবিএসকে বলেন, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো আছে, কিন্তু অর্গানোগ্রামে যত জনবল থাকার কথা, তার তুলনায় অনেক কম টেকনোলজিস্ট কর্মরত। তিনি জানান, অর্গানোগ্রাম সংশোধন করে আরও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তা বাস্তবায়ন হলে হাসপাতালগুলোতে দুই শিফটে ডায়াগনস্টিক সেবা চালু করা সম্ভব হবে।
অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কাজে লাগানোর উদ্যোগের কথাও জানান ডা. নুরুল। তাঁর ভাষ্য, কোন হাসপাতালে কোন যন্ত্র অব্যবহৃত পড়ে আছে, তার তালিকা ইতিমধ্যে করা হয়েছে। সেসব যন্ত্র অন্য হাসপাতালে বসানো শুরু হয়েছে, যাতে রোগীরা সেবা পান।
দুপুরের পর সেবা দিতে সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, আধুনিক ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি দিনের বড় একটি সময় অব্যবহৃত থাকে। অন্যদিকে সরকারি সেবা বন্ধ হয়ে গেলে রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশি খরচে সেবা নেন। তাঁর প্রস্তাব, সরকারি হাসপাতাল জায়গা ও ইউটিলিটি ব্যবহারের সুযোগ দেবে, আর বেসরকারি মালিকেরা সেবা পরিচালনা করবেন।
অধ্যাপক হামিদ বলেন, এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তাঁর মতে, বিভাগ ভাগ করে কোনো বিভাগের দায়িত্ব একটি প্রতিষ্ঠানকে, কোনোটি অন্য প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যেতে পারে। এভাবে করলে মানুষ কম দামে সেবা পাবে।

