হাসপাতালের শয্যা প্রায় ভরা, এর মধ্যেই দেশে একই সঙ্গে চলছে হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১২২ জনে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে চলতি বছর প্রাণ গেছে ২৫৬ জনের। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাওয়ায় রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা দুটোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের হাম ডেডিকেটেড ওয়ার্ডে গতকাল সকালে দেখা গেল সংকটের মানবিক চেহারা। ১৬ নম্বর শয্যায় ভর্তি ১১ মাস বয়সী শিশু মুসতাব। তাকে নিতে হবে পিআইসিইউতে। নিস্তেজ শিশুটি মায়ের কোলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। নাকে অক্সিজেনের পাইপ, মুখের ওপর স্কচটেপে আটকানো। পিআইসিইউতে নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে নার্সরা ক্যানোলা বসাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু হাত, পা বা মাথা, কোথাও শিরা পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্তানের শরীরে বারবার সুচ ফোটানো দেখে মা রিমা আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বারবার বলছিলেন, আল্লাহ যেন তাঁর বাচ্চাকে আর কষ্ট না দেন, সুস্থ করে দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল আটটা থেকে শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম ও উপসর্গে মোট শিশুমৃত্যু দাঁড়াল ১ হাজার ১২২। একই সময়ে হাম ও উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৫২ শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ৪৩ জন, বাকিরা উপসর্গের ভিত্তিতে হিসাবভুক্ত।
সাড়ে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও হাম পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীর চাপ এখনো রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে এখনো হামজনিত কারণে ভর্তি আছে ৯৮ শিশু। এখন পর্যন্ত শুধু এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ৯৮৯ শিশু, যাদের মধ্যে মারা গেছে ৯৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছরের মাসওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, হামের রোগী হঠাৎ করে বেড়েছে মার্চ থেকে। জানুয়ারিতে ভর্তি হয় দুই শিশু, ফেব্রুয়ারিতে ছয়, মার্চে ১৩০, এপ্রিলে ৩২৮, মে মাসে ৪৯৯ এবং জুনে ৫৩৪ জন। জুলাইয়ে ভর্তি হয় ৫০১, আগস্টে ৪৯৭ এবং সেপ্টেম্বরে ৪৬৬ জন। অক্টোবরের প্রথম কয়েক দিনে ভর্তি হয়েছে ২৬ জন।
বয়সভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ছয় থেকে নয় মাস বয়সী শিশু, ৯৪৯ জন। ছয় মাসের কম বয়সী রোগী ৬৩০, নয় মাস থেকে দুই বছর বয়সী ৭৭৮, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৩৫৩ এবং পাঁচ বছর বয়সী ২৭৯ জন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের শ্বাসতন্ত্র বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, হামের রোগী এখনো আছে। তবে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কমেছে। এখন বেশি দেখা যাচ্ছে আগে হামে আক্রান্ত হওয়া শিশুদের, যারা নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আবার হাসপাতালে আসছে।
ডেঙ্গুও পিছিয়ে নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেলের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৬০৮ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ২৫৬ এবং মোট আক্রান্ত ৮৪ হাজার ৩৬৯ জন। এ পর্যন্ত ৭৮ হাজার ৪৮২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ৬৩১ জন।
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু তার আচরণ বদলে ফেলেছে। আগে যেসব সাধারণ লক্ষণ দেখে রোগ চেনা যেত, এখন তা অনেক সময় দেখা যায় না। এখন ১০১ বা ১০২ ডিগ্রি জ্বরেও ডেঙ্গু ধরা পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে তীব্র জ্বর বা গায়ে র্যাশ থাকছে না। ফলে মানুষ এটিকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করছে। পরে রোগী হঠাৎ শকে চলে যাচ্ছে। এতে রোগী যেমন ভোগেন, চিকিৎসকেরাও বিপাকে পড়েন।
তাঁর পরামর্শ, সামান্য জ্বর, সর্দি বা কাশি হলেও ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো উচিত। দ্রুত শনাক্ত হলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মানলে রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার ঝুঁকি কমে। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং ক্যানসার, হৃদ্রোগ, কিডনি বা চোখের সমস্যার মতো অন্য রোগে ভোগা ব্যক্তিদের বেলায় বাড়তি সতর্কতা দরকার। যাঁরা একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে তাঁদের ক্ষেত্রে রোগ অনেক বেশি মারাত্মক হয়। এসব বিষয়ে নজর দিলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, হাসপাতালগুলো রোগীতে সয়লাব, কোথাও শয্যা ফাঁকা নেই।
প্রথমত, হামের পরিসংখ্যান একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ইঙ্গিত দেয়। শিশু হাসপাতালের হিসাবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর, প্রতি মাসেই ভর্তি ছিল ৩২৮ থেকে ৫৩৪ জনের মধ্যে। জুনে সর্বোচ্চ ৫৩৪ জন ভর্তি হওয়ার পর সংখ্যা সামান্য কমলেও তা এখনো উচ্চ পর্যায়ে স্থির আছে। অর্থাৎ সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসছে, এমন বলার সুযোগ এখনো নেই।
দ্বিতীয়ত, আক্রান্তদের বয়সের বিন্যাস উদ্বেগজনক। ছয় মাসের কম বয়সী ৬৩০ এবং ছয় থেকে নয় মাস বয়সী ৯৪৯ শিশু আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ মোট রোগীর বড় অংশই নয় মাসের কম বয়সী। হামের টিকা সাধারণত নয় মাস বয়সের পর দেওয়া হয়, ফলে এই শিশুরা টিকার সুরক্ষার বাইরে থাকে। তাদের সুরক্ষা অনেকটাই নির্ভর করে চারপাশের মানুষের টিকাপ্রাপ্তির হারের ওপর। এই তথ্য টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা ও টিকার ব্যবধান নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবনার জায়গা তৈরি করে।
তৃতীয়ত, নিশ্চিত ও উপসর্গভিত্তিক রোগীর ব্যবধান বড়। গত ২৪ ঘণ্টার ১ হাজার ১৫২ জনের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত মাত্র ৪৩ জন। এর একটি কারণ হতে পারে পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা। তবে এ নিয়ে প্রকৃত চিত্র বুঝতে আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রয়োজন, যাতে রোগের বিস্তার সঠিকভাবে মাপা যায়।
চতুর্থত, হাম থেকে সেরে ওঠা শিশুদের আবার নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা নিয়ে ফিরে আসা ইঙ্গিত দেয়, হামের ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক নয়। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে। তাই চিকিৎসা শেষে ফলোআপ ও পুষ্টির দিকে নজর রাখা জরুরি।
পঞ্চমত, ডেঙ্গুর আচরণ বদলে যাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য আলাদা ঝুঁকি। যখন লক্ষণ অস্পষ্ট হয়, তখন মানুষ দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যায়। ডা. কামরুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর রোগীরা বেশির ভাগই জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন। দেরিতে শনাক্তের এই প্রবণতা মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
ষষ্ঠত, একই সময়ে দুটি সংকটে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বহুগুণ বেড়েছে। শিশুদের শয্যা, আইসিইউ, চিকিৎসক ও নার্সের সক্ষমতা সীমিত। মুসতাবের শরীরে শিরা না পাওয়ার ঘটনাটি দেখায়, গুরুতর অসুস্থ ছোট শিশুদের চিকিৎসায় দক্ষ জনবল ও সরঞ্জাম কতটা জরুরি।
হাম ও ডেঙ্গু, দুটিই প্রতিরোধযোগ্য বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। তবু একটিতে এক হাজারের বেশি শিশু প্রাণ হারিয়েছে, অন্যটিতে ২৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সংকট থেকে বের হতে হলে টিকাদানের পরিধি ও সময়সূচি নিয়ে পর্যালোচনা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং সামান্য জ্বরেও দ্রুত পরীক্ষার সচেতনতা, এই তিন ক্ষেত্রেই একযোগে কাজ করা দরকার। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোও সমান জরুরি। না হলে রিমা আক্তারের মতো আরও অনেক মায়ের আহাজারি হাসপাতালের করিডরে শোনা যেতে থাকবে।

