ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) ক্যাথল্যাব গত তিন মাস ধরে বিকল হয়ে আছে। ফলে হাসপাতালটিতে বন্ধ রয়েছে করোনারি এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট বসানোর মতো জরুরি হৃদরোগ সেবা। এসব চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের খরচ ও দুর্ভোগ। কবে নাগাদ ল্যাবটি আবার চালু হবে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। কম খরচে বিশেষায়িত সেবা পাওয়ার ভরসায় এই সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের সংখ্যা সব সময়ই বেশি। হৃদরোগের জন্য এখানে আলাদা পূর্ণাঙ্গ বিভাগ আছে, আছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্স। কিন্তু ক্যাথল্যাব অচল থাকায় সেই কাঠামোর পুরো সুবিধা রোগীরা পাচ্ছেন না।
বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত ১ অক্টোবর। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাকলাইন রাসেল সেদিন ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। তাতে তিনি লেখেন, হৃদরোগের জন্য আলাদা বিভাগ এবং দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স থাকলেও ঢামেকের একমাত্র ক্যাথল্যাবটি তিন মাস ধরে বন্ধ। তাই এনজিওগ্রাম বা স্টেন্ট বসানোর দরকার হলে রোগীদের অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। মন্তব্যের ঘরে অনেকে সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে গিয়ে নিজেদের ভোগান্তির অভিজ্ঞতাও জানান।
সরেজমিনে ঢামেকে গিয়ে পোস্টের তথ্যের সত্যতা মেলে। হাসপাতালের ক্যাথ ওয়ার্ড ঘুরে জানা যায়, আগে প্রতি বুধবার এখানে এনজিওগ্রাম করা হতো। এখন যন্ত্র নষ্ট থাকায় সেই সেবা বন্ধ।
এই বন্ধ থাকার ভোগান্তির একটি উদাহরণ রাশেদ হাসান। বাবার এনজিওগ্রাম করাতে তিনি পটুয়াখালী সদর থেকে ঢামেকে এসেছিলেন। হাসপাতালে এসে জানতে পারেন, এখানে এ পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। পরে তাঁকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিভিডি) গিয়ে পরীক্ষাটি করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। দূর জেলা থেকে এসে খালি হাতে ফেরার এই অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর একার নয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, সমস্যাটি সম্পর্কে তাঁরা অবগত। এর সমাধান করা হবে এবং দ্রুতই ক্যাথল্যাব সচল করা হবে। তবে কত দিন লাগতে পারে, তা তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলেননি।
হৃদরোগের চিকিৎসায় ক্যাথল্যাব একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এখানে করোনারি এনজিওগ্রামের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের রক্তনালিতে ব্লক আছে কি না, তা শনাক্ত করা হয়। প্রয়োজন হলে এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে স্টেন্ট বসিয়ে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলে। গুরুতর ব্লক বা হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত এ ধরনের চিকিৎসা দরকার হতে পারে। তাই ক্যাথল্যাব বন্ধ থাকলে সময়মতো সেবা পাওয়ার সুযোগ কমে যায়।
খরচের ব্যবধানও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। বেসরকারি হাসপাতালে এনজিওগ্রামে হাসপাতালভেদে খরচ পড়ে ১৮ থেকে ২৫ হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালে ওষুধসহ একই সেবা মেলে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায়। স্টেন্ট বসানোর ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে সাধারণত এনজিওগ্রামের খরচ ও স্টেন্টের মূল্যের বাইরে বাড়তি হাসপাতাল চার্জ লাগে না। বেসরকারি হাসপাতালে স্টেন্টের দাম বাদ দিয়েও শুধু হাসপাতাল খরচই ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য ঢামেকের ক্যাথল্যাব ছিল বড় আশ্রয়।
ঢামেকের কার্ডিওলজি বিভাগের সাবেক প্রধান ডা. কাজী নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, দেড় মাস আগে তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যোগ দিয়েছেন। এর আগে তিনি ঢামেকের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়ই ক্যাথল্যাবটি অচল হয়ে পড়ে। এতে অনেক রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি জানান, ঢামেকে নামমাত্র মূল্যে সেবা দেওয়া হয় এবং মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীরাই আসেন। ল্যাব সচল হলে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন, তাই অতি দ্রুত এটি চালু করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
শুধু ঢামেক নয়, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই ধরনের সংকট দেশের আরও অনেক জায়গায় আছে। সরকার বিপুল অর্থ খরচ করে বিভাগীয় ও বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যাথল্যাব বসিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয়সংখ্যক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্রশিক্ষিত নার্সের অভাবে অনেক ল্যাব পুরোপুরি চালু করা যায়নি। কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটিতে কাজ বন্ধ, কোথাও জনবলের সংকটে সীমিত পরিসরে সেবা চলছে। অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হচ্ছে বিপুল অর্থে কেনা যন্ত্রপাতিও।
এর ফল ভোগ করছেন রোগীরাই। আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও অনেক হৃদরোগীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। আবার ঢাকার কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও তার একটি অংশ অচল। ফলে সেখানে গিয়েও অনেক রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন কিংবা অন্য হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

