এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে। ২০২৫ সাল শেষে কোম্পানিটিতে গ্রাহকদের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এটি জীবন বিমা খাতের মোট বকেয়া দাবির প্রায় ৭০ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ পুরো খাতের বড় অংশের দায় এককভাবে এই কোম্পানির ঘাড়ে।
একই বছরে দেশের জীবন বিমা খাতে মোট ৪ হাজার ৪০৩ কোটি ২০ লাখ টাকার দাবি বকেয়া থাকে। গ্রাহকরা মোট ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি ৫ লাখ টাকার দাবি উত্থাপন করেন। এর বিপরীতে কোম্পানিগুলো পরিশোধ করে ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৯২ জন গ্রাহক মোট ৩ হাজার ৪৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকার দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু কোম্পানিটি মাত্র ৫৮ হাজার ২১৫ জন গ্রাহককে ২১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। ফলে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৭ জন গ্রাহকের ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে। এতে বকেয়া দাবির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ শতাংশে।
শুধু দাবি পরিশোধেই নয়, কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যবস্থাপনা খাতে এর ব্যয় ছিল ৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অথচ আইন অনুযায়ী সীমা ছিল ৫২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ফলে অতিরিক্ত ২৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় করে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
বকেয়া দাবির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটি ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬৭ জন গ্রাহকের ২৬৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা পরিশোধ করেনি। একই বছরে ২ লাখ ৫৭ হাজার ২০৭ জন গ্রাহক ২৮০ কোটি ৮১ লাখ টাকার দাবি করেন। কিন্তু কোম্পানিটি মাত্র ৩ হাজার ৬৪০ জন গ্রাহকের ১১ কোটি ২১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও পরিস্থিতি একই রকম। ৮৪ হাজার ৯৪৩ জন গ্রাহকের ২২৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। সেখানে মোট দাবি ছিল ২৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫৬৮ জন গ্রাহককে ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৪২ হাজার ১৬২ জন গ্রাহকের ১৬২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। সেখানে মোট দাবি ছিল ২০৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ১১ হাজার ৪৩৪ জন গ্রাহককে ৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও উল্লেখযোগ্য বকেয়া রয়েছে। এখানে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৮ জন গ্রাহক ৯৯৮ কোটি ২ লাখ টাকার দাবি করেন। এর মধ্যে ১ লাখ ২৪ হাজার ২৪১ জনকে ৮৬৭ কোটি ১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে ৩৭ হাজার ৮১৭ জন গ্রাহকের ১৩১ কোটি ১ লাখ টাকা এখনো বকেয়া।
বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন। ৩৩ হাজার ৬১৮ জন গ্রাহকের ৮০ কোটি ৬১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। কোম্পানিটি মাত্র ৪৮৭ জন গ্রাহকের ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও বড় অঙ্কের বকেয়া রয়েছে। এখানে ২০ হাজার ৫০৩ জন গ্রাহকের ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার দাবি ছিল। এর মধ্যে ২ হাজার ১৭২ জনকে ৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দেওয়া হলেও ১৮ হাজার ৩৩১ জনের ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এখনো বকেয়া।
হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও একই চিত্র দেখা গেছে। ১৬ হাজার ৮৭৬ জন গ্রাহকের ৪০ কোটি ৩৩ লাখ টাকার দাবি ছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৬২৯ জনকে ৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে ১৫ হাজার ২৪৭ জন গ্রাহকের ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এখনো অনাদায়ি।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা কর্পোরেশনেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাবি বকেয়া রয়েছে। ২০২৫ সাল শেষে প্রতিষ্ঠানটিতে ৪ হাজার ২৮০ জন গ্রাহকের ৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। একই সময়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৮৬ জন গ্রাহক মোট ৭৫৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকার দাবি উত্থাপন করেন। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ ১৬ হাজার ৭০৬ জন গ্রাহককে ৬৯০ কোটি ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
দেশে কার্যরত একমাত্র বিদেশি জীবন বিমা কোম্পানি মেটলাইফেও বকেয়ার চিত্র রয়েছে। এখানে ১ হাজার ৭১৮ জন গ্রাহকের ৪৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে আছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে ৩ লাখ ৫ হাজার ৮৪৪ জন গ্রাহক মোট ২ হাজার ৯০২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে ৩ লাখ ৪ হাজার ১২৬ জন গ্রাহককে ২ হাজার ৮৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
এদিকে সান লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও বড় অঙ্কের দাবি বকেয়া রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৩ জন গ্রাহক মোট ৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার দাবি উত্থাপন করেন। বিপরীতে ১৩ হাজার ১১৫ জন গ্রাহককে ৩৯ কোটি ২২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে এখনো ১ লাখ ৩ হাজার ৩৪৮ জন গ্রাহকের ৩৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।
বিভিন্ন কোম্পানিতে বকেয়া দাবির চিত্র:
প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১৪ হাজার ২৫৪ জন গ্রাহকের ২৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। গার্ডিয়ান লাইফে ৪ হাজার ২৬২ জনের ১৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, ন্যাশনাল লাইফে ১ হাজার ৬৩৮ জনের ১২ কোটি টাকা এবং প্রগতি লাইফে ৬৮৭ জনের ৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা অনাদায়ি রয়েছে। মেঘনা লাইফে ৬২০ জনের ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা, পপুলার লাইফে ১ হাজার ২৩৭ জনের ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা, সন্ধানী লাইফে ৩৩৫ জনের ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং ডায়মন্ড লাইফে ৩১৪ জনের ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বকেয়া আছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দাবির পেছনে মূলত কয়েকটি কোম্পানির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাদের মতে, সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কারণে পুরো জীবন বিমা খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কোম্পানি পর্যায়ে ছোট অঙ্কের বকেয়া:
বেশ কয়েকটি কোম্পানিতে তুলনামূলক কম পরিমাণ বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে প্রটেক্টিভ লাইফে ১৮৯ জনের ৯৮ লাখ টাকা, আস্থা লাইফে ১০ জনের ১ লাখ টাকা, বেঙ্গল ইসলামী লাইফে ৯ জনের ১২ লাখ টাকা, বেস্ট লাইফে ১২ জনের ১২ লাখ টাকা এবং চাটার্ড লাইফে ৭ জনের ৩৩ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।
যমুনা লাইফে ২১ জনের ৫১ লাখ টাকা, এনআরবি ইসলামীক লাইফে ৯ জনের ১৬ লাখ টাকা, রূপালী লাইফে ৮৫৪ জনের ৪৩ লাখ টাকা, শান্তা লাইফে ২৭ জনের ৯ লাখ টাকা, স্বদেশ লাইফে ৩ জনের ২৪ লাখ টাকা, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফে ৩ জনের ২ লাখ টাকা এবং জেনিথ লাইফে ৪ জনের ৪ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।
যেসব কোম্পানি শতভাগ দাবি পরিশোধ করেছে:
কিছু কোম্পানি আবার সব দাবি পরিশোধ করে নজির স্থাপন করেছে। এর মধ্যে আকিজ তাকাফুল লাইফ ৩ হাজার ১০৪ জন গ্রাহকের ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা, আলফা লাইফ ৬ হাজার ৫৩২ জনের ৪১ কোটি ৩১ লাখ টাকা, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ ৯৪৩ জনের ৯ কোটি ২ লাখ টাকা, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৩ হাজার ৯৪৩ জনের ১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং সোনালী লাইফ ৫৫ হাজার ৩৩০ জন গ্রাহকের ৪০৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার দাবি শতভাগ পরিশোধ করেছে।
২০ কোম্পানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ:
একই সময়ে ২০টি কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, প্রোগ্রেসিভ লাইফ, এনআরবি ইসলামীক লাইফ, সান লাইফ, ডায়মন্ড লাইফসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে ব্যয় করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রগতি লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জালালুল আজিম বলেন, “বছরের শেষে কিছু দাবি অনিষ্পন্ন থাকতে পারে, কিন্তু এত বড় অঙ্কে বকেয়া থাকা স্বাভাবিক নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত বকেয়া পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।” তিনি আরও বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের দাবি পরিশোধের সক্ষমতা হারাচ্ছে। সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকে একীভূত করে সমাধানের পথে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং জেনিথ ইসলামী লাইফের সিইও এস এম নুরুজ্জামান বলেন, “অল্প কিছু কোম্পানির কারণে পুরো খাতে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের বিপুল অঙ্কের দাবি বকেয়া হয়ে আছে, যা স্বাভাবিক নয়।” তিনি আরও বলেন, গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা ও অতিরিক্ত ব্যয় বিমা খাতে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এতে নতুন প্রিমিয়াম সংগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, জীবন বিমা খাতে বকেয়া দাবি ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার অনিয়ম এখন পুরো খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।