পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের প্রতিষ্ঠান সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড–এর পরিচালনা পর্ষদ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে বিদ্যমান বীমা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের পর্ষদে আধিপত্য এবং শেয়ারধারণের বিষয়টি।
কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে মোট ১২ জন পরিচালক রয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জনই একই পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের প্রচলিত বীমা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের কন্যা নাসিম হক সিকদার। ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তার ছেলে মমতাজুল হক সিকদার। এছাড়া পরিচালকের পদে আছেন পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য। তাদের মধ্যে রয়েছেন লিজা ফাতেমা সিকদার, মনিকা সিকদার খান, জেফরি খান সিকদার, জোনাস খান সিকদার, মন্ডি খান সিকদার, সালাউদ্দিন খান ও মোহতাসিম বিল্লাহ খান। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদে কার্যত একই পরিবারের সদস্যদের প্রভাবই বেশি। ফলে করপোরেট সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিনিয়োগকারী মহলে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ২০১৬ সালের এক সার্কুলার অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা তার পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে একটি বীমা কোম্পানির ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবেন না। একই সঙ্গে প্রত্যেক উদ্যোক্তা পরিচালকের ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
সে হিসাবে, একই পরিবারের ৯ জন পরিচালক যদি ন্যূনতম ২ শতাংশ করে শেয়ার ধারণ করেন, তাহলে তাদের সম্মিলিত শেয়ারের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ শতাংশ। যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি এবং তা বীমা আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কোনো বীমা কোম্পানির পরিচালকরা সম্মিলিতভাবে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারেন না। একই সঙ্গে প্রত্যেক পরিচালকের ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তার ভাষ্য, সেই হিসাবে একই পরিবারের এত সদস্য একসঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ নেই। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে আইডিআরএ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সাড়ে পাঁচ মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ১০৭ শতাংশ। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ১৯ টাকা ৯০ পয়সা। সর্বশেষ বুধবার একদিনেই শেয়ারদর বেড়েছে ৩ টাকা ৪০ পয়সা বা ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
টানা মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে গত ৬ মে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিটিকে চিঠি দেয়। জবাবে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, কোনো অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ারদর বাড়ছে। তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোম্পানিটিতে পেশাদার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে এবং অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে সংগ্রহ করা ১৬ কোটি টাকা ‘অযৌক্তিকভাবে’ ব্যয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সিকদার পরিবারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল পরিবারটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৮৯টি দেশীয় এবং ১৪টি বিদেশি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্য বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। আইনগত জটিলতা এড়াতে তারা গণমাধ্যমের সামনেও আসছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে তারা বোর্ড সভায়ও অংশ নিচ্ছেন না, যা বীমা আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির সচিব আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন এবং আগের আইনগত বিষয় সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি অবগত নন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, যদি কোনো ধরনের আইনি ব্যত্যয় ঘটে থাকে তাহলে পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে গত কয়েক মাসে শেয়ারদরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।
২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব সম্পন্ন করার পর পুঁজিবাজারে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটির ট্রেডিং কোড ‘এসআইসিএল’। বর্তমানে এটি ‘বি’ ক্যাটেগরিতে লেনদেন হচ্ছে। ডিএসইর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৫০ দশমিক ৪০ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দখলে রয়েছে ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৪৩ দশমিক ০৫ শতাংশ শেয়ার।
২০২৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৪০ কোটি টাকা। এছাড়া রিজার্ভে রয়েছে ৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ৪ কোটি।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস হয়েছে ৬৩ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৭৭ পয়সা। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৩৫ পয়সায়।
৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৪ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। ওই বছরে কোম্পানিটির ইপিএস দাঁড়ায় ১ টাকা ২৮ পয়সা, যা আগের বছরে ছিল ৮২ পয়সা। একই সময়ে এনএভিপিএস দাঁড়ায় ১২ টাকা ২৮ পয়সায়।
এর আগে ২০২৩ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানিটি। ওই বছরে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ১ টাকা ৩৪ পয়সা। আগের বছরে যা ছিল ১ টাকা ২২ পয়সা। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছিল ৩০ টাকা ৪৯ পয়সায়।
সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উত্থান, পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যদের আধিপত্য এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানিটির আর্থিক সূচক ও শেয়ারদরের গতিবিধির মধ্যে অসামঞ্জস্যের বিষয়টিও এখন আলোচনায় এসেছে।

