বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই আবার বড় ধরনের সংকটে পড়েছে উত্তরা ফাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং দুই স্বতন্ত্র পরিচালক একসঙ্গে পদত্যাগ করায় পর্ষদের কার্যকর নেতৃত্ব অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পাঁচ সদস্যের পর্ষদে চারজন সরে যাওয়ার পর এখন পরিচালক হিসেবে রয়েছেন মাত্র দুজন।
পদত্যাগ করা চারজন হলেন উত্তরা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ও এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুখতার হোসেন, স্বতন্ত্র পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. নিয়ামুল কবির, স্বতন্ত্র পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়ালি উল্লাহ।
এই একযোগে পদত্যাগকে প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, মাত্র কয়েক মাস আগেই উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বের করে আনার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্ষদ পুনর্গঠন করেছিল।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদ নতুন করে সাজায়। চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং উত্তরা গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মাহবুব আলমকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের পর্ষদ গঠন করা হয়েছিল। নতুন কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মূল উদ্যোক্তা পরিবারের প্রভাব কমিয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
কিন্তু সেই উদ্যোগের কয়েক মাসের মধ্যেই চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দুই স্বতন্ত্র পরিচালকের বিদায় পরিস্থিতিকে আবারও জটিল করে তুলেছে। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদে একই সময়ে এতজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সরে যাওয়া শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করায় দৈনন্দিন পরিচালন কার্যক্রমেও নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মো. ওয়ালি উল্লাহ উত্তরা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এক বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর এবার তিনি পদত্যাগ করলেন।
চারজনের পদত্যাগের পর উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন স্বতন্ত্র পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আজম এবং উত্তরা গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও পরিচালক মাহবুব আলম।
অর্থাৎ যে পর্ষদটি কয়েক মাস আগে পাঁচ সদস্য নিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছিল, সেটিই এখন মাত্র দুজন পরিচালককে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতীতে বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেখানে নতুন করে পরিচালনা কাঠামোর অস্থিরতা আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানটির একটি পক্ষ নতুন পরিচালকদের ওপর বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে পরিচালকদের মধ্যে আলোচনা হওয়ার পর তারা একযোগে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা পদত্যাগকারী পরিচালকদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তারপরও একই সময়ে চারজন গুরুত্বপূর্ণ পরিচালকের সরে যাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে নতুন পর্ষদ গঠনের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন পরিবর্তন কেন হলো, সেই কারণ স্পষ্ট হওয়া প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা নিয়ে এর আগেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের পর ২০২২ সালে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা গ্রুপসংশ্লিষ্ট পাঁচ পরিচালককে অপসারণ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান রাশেদুল হাসান, উত্তরা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, তাঁর ভাই ও পরিচালক মুজিবুর রহমান এবং উত্তরা পরিবারের সদস্য ও পরিচালক জাকিয়া রহমান ও নাঈমুর রহমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ২০১৯ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছিল।
অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল আমানতের অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, কলমানির অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত কাজে লাগানো, অগ্রিম ও আগাম পরিশোধের নামে অর্থ বের করে নেওয়া এবং ভুয়া এফডিআরের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে সব মিলিয়ে অন্তত ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
এই অঙ্কটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সমস্যার পরিমাণ বোঝায় না; এটি তৎকালীন পরিচালনা কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। আমানতকারীদের অর্থ ব্যবস্থাপনা, ঋণ বিতরণ এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তখন সামনে আসে।
এসব অভিযোগের পরই তৎকালীন পর্ষদ ভেঙে নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির পথে যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন পাঁচ সদস্যের পর্ষদ দায়িত্ব নেয়।
স্বাভাবিকভাবেই তখন প্রত্যাশা ছিল, নতুন পরিচালনা পর্ষদ প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো সমস্যা কাটিয়ে উঠতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দুই স্বতন্ত্র পরিচালকের পদত্যাগ সেই প্রত্যাশার সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
উত্তরা ফাইন্যান্সের সামনে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথমত, বর্তমান দুই পরিচালককে নিয়ে পর্ষদের কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, দ্রুত নতুন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে কি না। তৃতীয়ত, পদত্যাগের পেছনে যে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে, সেটি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হবে কি না।
এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো আর্থিক অনিয়মের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতের বড় অনিয়মের অভিযোগের পর পর্ষদ পুনর্গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা। সেই প্রক্রিয়ার মাঝপথে শীর্ষ পর্যায়ের পরিচালকদের একযোগে সরে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির পুনর্গঠন কতটা এগিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুধু নতুন পরিচালক নিয়োগ করলেই সংকটের সমাধান হয় না। পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হয়।
উত্তরা ফাইন্যান্সের ক্ষেত্রে তাই এখন মূল বিষয় শুধু কে নতুন চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক হবেন, তা নয়। বরং প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় স্থিতিশীলতা কত দ্রুত ফিরবে, পুরোনো অনিয়মের দায় কীভাবে নির্ধারণ হবে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

