বিপাকে থাকা সাতটি জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানের ৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহকের বকেয়া বিমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। দুই ধাপে এসব গ্রাহককে মোট ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা দিয়েছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিমা দাবি পরিশোধে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থের ব্যবস্থা করেছে আইডিআরএ। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানিগুলোর সম্পদ ও সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে পাওয়া অর্থও রয়েছে।
প্রথম ধাপে বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহককে ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ধাপে পদ্মা ইসলামী, হোমল্যান্ড, ফারইস্ট ইসলামী, সানফ্লাওয়ার ও সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫ হাজার ৮৬৮ জন গ্রাহকের মধ্যে ২৩ কোটি ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
আরও বড় অঙ্কের দাবি এখনো বকেয়া
বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ ভূঁইয়া জানান, কোম্পানি এখনো নিজেদের কোনো সম্পদ, ট্রেজারি বিল বা বন্ড বিক্রি করেনি। তবে সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, কোম্পানির বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদের আয় ব্যবহার করেই বিমা গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে অর্থের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
নূর মোহাম্মদ ভূঁইয়ার হিসাব অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৩০ হাজার গ্রাহকের প্রায় ১০০ কোটি টাকার দাবি পরিশোধ বাকি রয়েছে। এসব দাবি পুরোপুরি পরিশোধ করতে এক মাস, এক বছর নাকি দুই বছর লাগবে—এ মুহূর্তে তা বলা কঠিন।
তবে অর্থের ব্যবস্থা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা হবে বলে জানান তিনি।
পরে তিনি জানান, কোম্পানির বর্তমান সম্পদ ও হাতে থাকা সম্পদ দিয়ে বকেয়া দাবির প্রায় ৮০ শতাংশ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
সম্পদ বিক্রি করে দাবি মেটানোর চেষ্টা
পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কোম্পানি বর্তমানে মূলধন থেকে পাওয়া সুদের আয় দিয়ে কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাচ্ছে।
গ্রাহকদের কাছে কোম্পানিটির প্রায় ৮০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। সম্পদ উদ্ধার ও বিক্রি করে ধীরে ধীরে এসব দাবি পরিশোধের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, রাজধানীর মালিবাগে কোম্পানির ৮ দশমিক ৫ কাঠা জমি মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এই জমি থেকে ৪০ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাওয়ার আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া বসুন্ধরায় কোম্পানিটির আরও ৪০ কাঠা জমি রয়েছে।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুর রহিম ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
বকেয়া দাবি পরিশোধ চলবে
আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নীবিন বলেন, বৈধ বিমা দাবি দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে বিমা দাবি পরিশোধ করা গেলে খাতটির প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।
তার মতে, বকেয়া দাবি পরিশোধের মাধ্যমে শুধু গ্রাহকদের আর্থিক অধিকারই নিশ্চিত হবে না, একই সঙ্গে পুরো বিমা খাতের ওপর মানুষের আস্থাও ফিরবে।
আইডিআরএর এই উদ্যোগ প্রথম দুই ধাপেই শেষ হচ্ছে না। যেসব বৈধ দাবি এখনো পরিশোধ হয়নি, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ধাপে ধাপে অর্থ দেওয়া হবে।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান বলেন, গ্রাহকদের বৈধ অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ বলেন, বর্তমানে যতটুকু অর্থ গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, পরিমাণ কম হলেও সেটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত।
তার মতে, বিমা কোম্পানিগুলোর হাতে থাকা সম্পদ থেকে যতটা সম্ভব অর্থ উদ্ধার করে তা গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি বিমা দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করতে বর্তমান আইন পর্যালোচনা করে আরও কঠোর প্রয়োগের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইডিআরএর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

