বাংলাদেশের ১৭টি জীবন বিমা কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত বা অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা ১৪ জন ব্যক্তি এরই মধ্যে জীবন ও সাধারণ বিমা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
বিমা খাতের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যোগ্য লোকের অভাব নয়, বরং পরিচালনা পর্ষদের অনীহাই নিয়মিত প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখতে চান। ফলে নিয়মিত নিয়োগের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব কেবল দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, গ্রাহকের আস্থা তৈরি, বিমার দাবি নিষ্পত্তি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই পদটি সরাসরি যুক্ত। দীর্ঘদিন নিয়মিত প্রধান নির্বাহী না থাকলে এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই পরিস্থিতিতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গত ১৩ আগস্ট নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। কোনো বিমা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে নিয়মিত প্রধান নির্বাহী নিয়োগে ব্যর্থ হলে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরি প্রধান নির্বাহী তালিকা আরও সম্প্রসারণ করা হবে। এরপর সেই তালিকা থেকে দুজন ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হবে। পরিচালনা পর্ষদ ওই দুজনের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার গণমাধ্যম ও যোগাযোগ পরামর্শক এবং মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জানিয়েছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত প্রধান নির্বাহী নিয়োগ করতে না পারায় বিমা খাতের শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি না রেখে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, প্রধান নির্বাহী হওয়ার আগ্রহ রয়েছে এমন বেশ কয়েকজনকে এরই মধ্যে তালিকায় রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেখান থেকেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রার্থী দেওয়া হবে।
২০২৫ সালে বিমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী হতে আগ্রহী ব্যক্তিদের নিয়ে প্রথম তালিকা তৈরি করা হয়। পরে ২০২৬ সালে সেই তালিকায় আরও কয়েকজন যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে জীবন বিমা খাতে সাতজন এবং সাধারণ বিমা খাতে আরও সাতজন প্রধান নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
প্রধান নির্বাহী তালিকার সদস্য এবং চার্টার্ড লাইফের সাবেক প্রধান নির্বাহী এস এম জিয়াউল হক বলেন, তালিকাভুক্ত সবাই বিমা খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে উচ্চশিক্ষিত এবং প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয় দক্ষতাও রয়েছে।
তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রধান নির্বাহী সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী দিয়ে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও তালিকায় থাকা যোগ্য প্রার্থীদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমানে নিয়মিত প্রধান নির্বাহী ছাড়া পরিচালিত ১৭টি জীবন বিমা প্রতিষ্ঠান হলো আকিজ তাকাফুল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বৈরা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী এস এম নূরুজ্জামান বলেন, কোনো জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত প্রধান নির্বাহী না থাকলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ও পরিচালন ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রধান নির্বাহীর ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন পদটি খালি থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিমা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব প্রতিষ্ঠান লাখ লাখ গ্রাহকের আর্থিক স্বার্থ পরিচালনা করে। গ্রাহকের কাছ থেকে প্রিমিয়াম সংগ্রহ, বিমার দাবি পরিশোধ, বিনিয়োগ পরিচালনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে প্রধান নির্বাহীর নেতৃত্ব সরাসরি সম্পর্কিত।
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে এর প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা, দাবি নিষ্পত্তির গতি, গ্রাহকসেবা এবং বিমা গ্রাহকদের আস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিমা খাতের দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব সংকট সমাধানে শুধু নিয়মিত প্রধান নির্বাহী নিয়োগের নির্দেশ দিলেই হবে না। পরিচালনা পর্ষদের স্বচ্ছতা, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি এবং দীর্ঘদিন পদ খালি রাখার প্রবণতা বন্ধ করাও জরুরি। কারণ বিমা খাতের মতো মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি খাতে নেতৃত্বের স্থায়িত্ব সরাসরি সুশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নিয়মিত প্রধান নির্বাহী নিয়োগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন উদ্যোগ তাই শুধু একটি পদ পূরণের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়ানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পরিচালনা পর্ষদগুলো বাস্তবে কতটা যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেয় তার ওপর।

