শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান মাইডাস ফাইন্যান্সিং পিএলসির আর্থিক দুরবস্থা দিন দিন আরও গভীর হয়ে উঠছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় অর্ধেকের বেশি—৫৫ শতাংশই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। মূলধন ঘাটতি, ঋণাত্মক শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটি এবং বিপুল অঙ্কের লোকসান মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন চরম আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
কোম্পানিটির ২০২৫ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের নিরীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং পার্টনারের স্বাক্ষরিত এই প্রতিবেদনে মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের আর্থিক কাঠামোর একাধিক দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কোম্পানিটির মোট লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৮৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৪৩২ কোটি টাকাই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে—যা মোট ঋণের প্রায় ৫৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, একচল্লিশটি পৃথক লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে কোম্পানিটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা, আর অন্যান্য খাতে আরও ছয় কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
কোম্পানিটির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থার সংকট স্পষ্ট হয়েছে আয়-ব্যয়ের হিসাবেও। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট সুদ আয় ছিল প্রায় ৪৭ কোটি টাকা এবং মোট পরিচালন আয় প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে বছরটিতে কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ৩৩৫ কোটি টাকা—অর্থাৎ আয়ের তুলনায় লোকসানের অঙ্ক বহুগুণ বেশি।
একই সঙ্গে কোম্পানিটির মূলধন পর্যাপ্ততার হারে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকায়। শেয়ারহোল্ডারদের সম্মিলিত ইক্যুইটিও ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬৬ কোটি টাকায়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, আমানতকারীদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে।
টানা তিন বছর ধরে কোনো ধরনের লভ্যাংশ ঘোষণা না করায় কোম্পানিটির শেয়ার ইতিমধ্যে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। এই পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও একটি বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি সচিব জানান, গত কয়েক বছর ধরে দেশের সার্বিক আর্থিক খাত ভালো অবস্থায় নেই। বিশেষত লিজিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় অনেক আমানতকারী নতুন করে টাকা জমা রাখার বদলে বরং জমানো অর্থ তুলে নিতে চাইছেন, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের সংকট তীব্র হয়েছে। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাবে অনেক ব্যবসায়ী তাদের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারায় ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন বলেও তিনি জানান।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের সামগ্রিক দুর্বলতার একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের এই সংকট। খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার, ক্রমবর্ধমান লোকসান এবং তারল্য সংকট মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আগামী দিনে টিকে থাকতে হলে কার্যকর ও দ্রুত পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা।

