দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডিএসই জানিয়েছে, আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। গতকাল রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
যেসব পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেগুলো হলো মশিহর সিকিউরিটিজ, ব্যাংকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড।
ডিএসই চেয়ারম্যান জানান, মোট ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারী ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করেছেন। এসব আবেদনে দাবি করা অর্থের পরিমাণ ছিল ২৫০ কোটি টাকার বেশি।
যাচাই শেষে ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীকে মোট ৭২ কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আবেদন করা বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৯৭ শতাংশ তাদের সম্পূর্ণ পাওনা অর্থ ফেরত পাবেন।
ডিএসই জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কিছু বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।
অন্যদিকে যেসব বিনিয়োগকারীর পাওনা এখনো বাকি রয়েছে, তাদের অর্থ পরিশোধের জন্য খেলাপি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও শেয়ার বিক্রি এবং সুরক্ষা তহবিল থেকে অর্থ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম এই উদ্যোগকে দেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, অনেক মানুষ তাদের সঞ্চয় ও অবসরকালীন অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছিলেন। অনিয়মের কারণে তাদের অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলেন। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য ডিএসই বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল গঠন করেছে। বর্তমানে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্মিলিত গ্রাহক হিসাব থেকে অর্জিত সুদের একটি অংশ প্রতি ছয় মাসে এই তহবিলে জমা দেয়।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ডিএসই বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যাতে কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সম্মিলিত হিসাব থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তা কঠিন হয়।
তার মতে, এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার কারণে গত আড়াই বছরে এ ধরনের নতুন কোনো ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে সামনে আসা ঘটনাগুলো মূলত আগের সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে সালতা ক্যাপিটালের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার জানান, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে কয়েকটি সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডিএসই।ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার জানান, বাজারে লেনদেনের গতি বাড়াতে এবং তারল্য উন্নত করতে শেয়ার সমন্বয় ব্যবস্থা ও দ্রুত নিষ্পত্তি পদ্ধতি চালুর কাজ এগিয়ে চলছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সহযোগিতায় ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া আর্থিক ডেরিভেটিভ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করার পর ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে এটি চালুর পরিকল্পনা করছে ডিএসই।
খোলা ধরনের মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজও চলছে। এই প্ল্যাটফর্ম চালু হলে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি মিউচুয়াল ফান্ড কেনা, বিক্রি ও অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য তথ্য সহজলভ্য করতে নতুন ওয়েবসাইট চালু করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। নতুন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজারসংক্রান্ত তথ্য আরও সহজে পেতে পারবেন।
ডিএসই জানিয়েছে, নতুন ওয়েবসাইটে কোম্পানিভিত্তিক তথ্য আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। ফলে একটি কোম্পানি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সব তথ্য এক জায়গা থেকেই পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া পুঁজিবাজার সম্পর্কিত আইন ও নীতিমালাগুলোও একটি নির্দিষ্ট অংশে একত্র করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা সহজে তথ্য খুঁজে পান।
তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে পুরোনো ও নতুন—দুই ওয়েবসাইটই চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চালু থাকবে।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এই উদ্যোগ পুঁজিবাজারে আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি, প্রযুক্তিগত সুরক্ষা এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

