নন-লাইফ বিমা খাতের জরিপকারীদের লাইসেন্স ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। নতুন লাইসেন্সের ফি ২৫ গুণ বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান ‘নন-লাইফ বিমা জরিপকারী (লাইসেন্স) বিধিমালা, ২০১৮’-এর সংশোধিত খসড়ায় এসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে খসড়াটির বিষয়ে মতামত চেয়েছে কর্তৃপক্ষ। সাত দিনের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো মতামত না পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নন-লাইফ বিমা জরিপকারীরা বিমাকৃত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, দুর্ঘটনা এবং বিমা দাবি স্বাধীনভাবে তদন্ত ও মূল্যায়ন করেন। আগুন, দুর্ঘটনা, চুরি, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি পরিদর্শন করে ক্ষতির পরিমাণ ও কারণ নির্ধারণ করেন তারা। একই সঙ্গে ক্ষতিটি বিমা চুক্তির আওতায় পড়ে কি না, সেটিও যাচাই করা হয়।
এ জন্য জরিপকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ছবি এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করে বিমা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেন। এসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকের দাবির অর্থ ও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করে।
বিমা আইন, ২০১০-এর সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় ২০১৮ সালে নন-লাইফ বিমা জরিপকারীদের লাইসেন্সের জন্য পৃথক বিধিমালা চালু করে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ। ওই বছরের ২৩ অক্টোবর বিধিমালাটি সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়।
বিধিমালায় কাজের ধরন অনুযায়ী জরিপকারীদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে অগ্নিবিমা, নৌপথে পণ্য পরিবহন, নৌযান, মোটরযান, প্রকৌশল, উড়োজাহাজ এবং অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রয়োজন হলে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে নতুন শ্রেণি যুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে জরিপকারীর লাইসেন্স পেতে আবেদনকারীকে স্বীকৃত দেশি বা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকতে হবে। পাশাপাশি জরিপকারী হিসেবে কমপক্ষে পাঁচ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
আবেদনকারী কোনো বিমা কোম্পানি, বিমা এজেন্ট, দালাল বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে পারবেন না। এ ছাড়া লাইসেন্সধারী কোনো জরিপকারীর অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে অন্তত পাঁচ বছর বাস্তব প্রশিক্ষণ নেওয়ার শর্তও রয়েছে। লাইসেন্সের আবেদনের সঙ্গে সেই প্রশিক্ষণের সনদ জমা দিতে হয়।
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী জরিপকারীর লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নবায়নের জন্য আবেদন করা যায়। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অতিরিক্ত ফি দিয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ রয়েছে।
সংশোধিত খসড়ায় নতুন ও নবায়ন করা—উভয় ধরনের লাইসেন্সের মেয়াদ দুই বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
লাইসেন্স নবায়নের সময় জরিপকারীদের কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে যাচাই করার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। বর্তমানে আগের এক বছরে জমা দেওয়া জরিপ প্রতিবেদনগুলোর শ্রেণিভিত্তিক বিবরণ দিতে হয়। সংশোধনের পর এই সময়সীমা বাড়িয়ে দুই বছর করা হবে।
সংশোধনী প্রস্তাবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে লাইসেন্স ফিতে। ২০১৮ সালের বিধিমালার ১৩ নম্বর বিধি অনুযায়ী বর্তমানে নতুন লাইসেন্সের ফি ২ হাজার টাকা। লাইসেন্স নবায়নে দিতে হয় ১ হাজার টাকা। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়নের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে ১০০ টাকা অতিরিক্ত ফি এবং লাইসেন্সের নকল কপির জন্য ১০০ টাকা দিতে হয়।
সংশোধিত খসড়ায় নতুন লাইসেন্সের ফি ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় ফি বাড়বে ৪৮ হাজার টাকা বা ২ হাজার ৪০০ শতাংশ। ফলে নতুন লাইসেন্সের ফি হবে বর্তমানের ২৫ গুণ।
এ ছাড়া নবায়ন ফি ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়নের অতিরিক্ত ফি প্রতি মাসে ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং লাইসেন্সের নকল কপির ফি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিধিমালা হালনাগাদ করাই এই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে সময় ও ব্যয় কমানো, ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো এবং বাজারদর বিবেচনায় সরকারি ফি নিয়মিতভাবে সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া লাইসেন্স সময়মতো নবায়নের সুযোগ সহজ করা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি আরও জোরদার করাও সংশোধনের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

