প্রায় ৫০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানকে ঘিরে রয়েছে তীব্র চাপ, সন্দেহ, কূটনৈতিক দূরত্ব এবং ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা। পারমাণবিক কর্মসূচি, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন—এমন নানা অভিযোগের জেরে দেশটির ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ফলে ইরান এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটি।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন: এত চাপের পরও ইরান কি সত্যিই আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে? কাগজে-কলমে অনেকের কাছে উত্তরটি “হ্যাঁ” মনে হতে পারে। বাস্তবে চিত্রটি অনেক বেশি জটিল। কারণ নিষেধাজ্ঞা ইরানকে দুর্বল করেছে, কিন্তু পুরোপুরি অচল করতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে দেশটি তার বাণিজ্য কাঠামো বদলেছে, অংশীদার বদলেছে, লেনদেনের পদ্ধতি বদলেছে, এমনকি অর্থনীতির ভরকেন্দ্রও বদলেছে।
এই পুনর্গঠনের পেছনে রয়েছে তিনটি বড় কারণ: প্রথমত, নতুন বাণিজ্য অংশীদার খোঁজার সক্ষমতা; দ্বিতীয়ত, তেল-নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির দিকে যাত্রা; তৃতীয়ত, ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করা। তবে এই গল্প একরৈখিক নয়। এখানে যেমন টিকে থাকার কৌশল আছে, তেমনি আছে গভীর দুর্বলতা, অবকাঠামোগত ক্ষতি, যুদ্ধঝুঁকি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক অস্থিরতা।
নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতিকে কাঁপিয়েছে, কিন্তু থামাতে পারেনি
নিষেধাজ্ঞার অভিঘাত যে হালকা ছিল, এমন বলা যাবে না। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বেকারত্ব তীব্র হয়েছে, প্রায়ই জনবিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সামগ্রিক বাণিজ্যের গ্রাফও কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় হলো, এমন অবস্থার মধ্যেও অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, ইলেকট্রনিকস এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিতে পুরোপুরি ভাটা পড়েনি। অন্যদিকে ইরান তেল, গ্যাস, নির্মাণসামগ্রী এবং বিশেষ ধরনের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক লেনদেন ধরে রেখেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সত্য কাজ করেছে: কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপালেই যে সেই দেশ হঠাৎ করে বিশ্ববাণিজ্য থেকে মুছে যাবে, বাস্তবে তা ঘটে না। বরং দেশটি বিকল্প নেটওয়ার্ক, বিকল্প মুদ্রা, বিকল্প মধ্যস্থতাকারী এবং বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করে। ইরানের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
আপনার দেওয়া তথ্যে উল্লেখ আছে, ২০১৯ সাল থেকে অন্তত ১৭০টি দেশের সঙ্গে পণ্য আদানপ্রদান করেছে ইরান। এই সংখ্যাটি নিজেই দেখায়, আন্তর্জাতিক চাপ যতই থাকুক, ইরান পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। বরং পশ্চিমা অর্থনৈতিক জোটের বাইরে বিশ্বের বড় একটি অংশের সঙ্গে দেশটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পেরেছে।
“একঘরে” ইরান—বাস্তবে কতটা?
ইরানকে ঘিরে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, দেশটি নাকি বিশ্ববাণিজ্য থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছে। বাস্তবে বিষয়টি আরও বহুস্তরবিশিষ্ট। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বুর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন-এর সিইও এসফান্দিয়ার বাতমানগেলিদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের বাণিজ্য বরং আরও জটিল ও বহুমুখী হয়েছে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সংযোগ কমেনি—তার রূপ বদলেছে।
এই পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইরানের অর্থনীতিকে বোঝার জন্য নতুন একটি ফ্রেম দেয়। প্রশ্ন তখন আর শুধু “ইরান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত?” নয়; প্রশ্ন হয় “ইরান কীভাবে ক্ষতির মধ্যেও নতুন বাণিজ্যপথ বানিয়েছে?”
এই উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে চীনের নাম।
ইরানের অর্থনীতির কেন্দ্রীয় সঙ্গী এখন চীন
গত দুই দশকে ইরানের আমদানি ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই চীনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতটাই বেড়েছে যে, বেইজিং এখন তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। এই সম্পর্কের মূল শক্তি শুধু জ্বালানি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বোঝাপড়া।
করোনা মহামারি চলাকালীন চীন ঘোষণা দিয়েছিল, আগামী কয়েক দশকে তারা ইরানে ৪০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এর বিনিময়ে তারা পাবে ইরানের তেলের নিরবচ্ছিন্ন জোগান। এই সমঝোতা শুধু একটি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নয়, বরং নিষেধাজ্ঞাকবলিত অর্থনীতির জন্য একটি “লাইফলাইন” হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, ২০২৪ সালে ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই কিনেছে চীন। আবার ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইরানের তেল-বহির্ভূত রপ্তানি পণ্যের—মূলত রাসায়নিক ও ধাতু—প্রায় এক-চতুর্থাংশও গেছে চীনে। এর আর্থিক মূল্য কয়েকশো কোটি ডলার। এই দুটি তথ্য দেখায়, চীন শুধু তেলের ক্রেতা নয়; ইরানের বৈচিত্র্যময় রপ্তানি কাঠামোরও বড় ভরসা।
ডলার ছাড়াই বাণিজ্য: নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বড় কৌশল
ইরান-চীন বাণিজ্যের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো লেনদেনের মাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে পাশ কাটাতে ডলারকে প্রায় পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। তার বদলে ব্যবহার হচ্ছে চীনা মুদ্রা রেনমিনবি। অর্থাৎ, ইরানকে চাপ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যে আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে, ইরান সেই ব্যবস্থার বাইরেই লেনদেনের পথ তৈরি করেছে।
এটি কেবল আর্থিক কৌশল নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতারও ইঙ্গিত। বহু দেশ এখন বুঝতে শিখেছে যে, ডলার-নির্ভরতা মানে রাজনৈতিক ঝুঁকিও। ইরানের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি সরাসরি বাস্তব। ফলে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার তাদের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ইরানের মোট আমদানি পণ্যের ৩০ শতাংশই আসে চীন থেকে। আসবাবপত্র থেকে সূর্যমুখীর বীজ—সবই এই তালিকায় আছে। এর মানে, চীন শুধু ক্রেতা নয়; একই সঙ্গে বড় সরবরাহকারীও। অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক একমুখী নয়, বরং গভীরভাবে পারস্পরিক।
আনুষ্ঠানিক হিসাবের আড়ালে “ছায়া অর্থনীতি”
ইরানের বাণিজ্য নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। বিশেষজ্ঞরা দেশটির সরকারি তথ্যের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে চান না, আবার সহযোগী দেশগুলোও সব লেনদেনের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ করে না। এই অনিশ্চয়তার জায়গাটিই ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞার ফাঁস এড়াতে ইরান একটি “শ্যাডো ইকনমি” বা ছায়া অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। এতে শেল কোম্পানি, বেনামি মধ্যস্থতাকারী, তৃতীয় দেশের ব্যাংক এবং ঘুরপথে পণ্য সরবরাহের মতো পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যাতে প্রকৃত বিক্রেতা বা ক্রেতার পরিচয় আড়াল থাকে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তেলের বিনিময়ে অবকাঠামো নির্মাণের মতো বার্টার ব্যবস্থাও দেখা যায়—যেখানে অর্থের বদলে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য বা সেবা দেওয়া হয়।
অর্থনীতির ভাষায়, এটি একধরনের অভিযোজন। কিন্তু নীতির ভাষায়, এটি উচ্চঝুঁকির অঞ্চল। কারণ এমন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা কম থাকে, মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা বাড়ে, দুর্নীতির ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক সক্ষমতা মাপা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তেল-নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা
ইরানের অর্থনৈতিক টিকে থাকার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো, দেশটি সময়ের সঙ্গে তেল-নির্ভরতা কমিয়েছে। বিশ বছর আগে ইরানের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ ছিল পেট্রোলিয়াম। কিন্তু এখন চিত্রটি বদলেছে। এই পরিবর্তন স্বেচ্ছায় আসেনি; অনেকটাই চাপের মুখে এসেছে।
বারাক ওবামার আমলে যখন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়, তখন ইরান তীব্রভাবে বুঝতে পারে যে কেবল জ্বালানি রপ্তানির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়। তেল বিক্রি আটকে গেলে পুরো অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে। এর পর থেকেই তারা অন্যান্য খাত—বিশেষ করে রাসায়নিক, ধাতু, নির্মাণসামগ্রী, কৃষিপণ্য এবং কিছু শিল্পপণ্যে জোর দিতে শুরু করে।
এসফান্দিয়ার বাতমানগেলিদজের মতে, ২০১২ সালের আগপর্যন্ত ইরানের অর্থনীতিতে এত বড় চাপ পড়েনি। ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে দেশটিতে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছিল। সেই সময়ের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ পরবর্তী বৈচিত্র্য আনার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞার আগে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুঁজি তৈরি হয়েছিল, পরের ধাক্কা সামলাতে তা কিছুটা সহায়ক হয়েছে।
২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির পর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও ২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার কড়াকড়ি শুরু করলে ইরান দ্রুত পুরোনো কৌশলে ফিরে যায়। হার্ভার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ইরান প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলারের তেল-বহির্ভূত পণ্য রপ্তানি করেছে—যা কোস্টারিকা, ইকুয়েডর বা ক্রোয়েশিয়ার মোট রপ্তানির প্রায় সমান। এই তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে ইরানের তেল-বাইরের রপ্তানি মোটেও সামান্য নয়।
ভৌগোলিক অবস্থান: ইরানের সবচেয়ে বড় “তুরুপের তাস”
ইরানের অর্থনীতির শক্তি শুধু পণ্য উৎপাদন বা রপ্তানিতে নয়; তার ভূগোলেও। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক ও তুরস্কসহ সাতটি দেশের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। একদিকে কাস্পিয়ান সাগরের বন্দর, অন্যদিকে কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব—এই অবস্থান ইরানকে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে এমন এক জায়গায় বসিয়েছে, যাকে সহজে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
ভূগোলের এই শক্তি অর্থনীতিতে দুইভাবে কাজ করে। প্রথমত, স্থলপথে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রপথে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের ওপর কৌশলগত প্রভাব তৈরি হয়। চীনের বাইরে তুরস্ক ও ইরাক ইরানের বড় ক্রেতা। ২০১৯ সাল থেকে দেশটির তেল-বহির্ভূত মোট রপ্তানি বাণিজ্যের অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে এই তিন দেশের সঙ্গে।
এটি দেখায় যে, ইরানের অর্থনীতি কেবল মহাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং আঞ্চলিক বাজারও তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুয়েত ইরানের সিমেন্ট ও ভেড়ার অন্যতম প্রধান ক্রেতা। বুলগেরিয়া, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলো বিপুল পরিমাণ প্যাকিং সামগ্রী কেনে। আর স্পেনে যে জাফরান আমদানি হয়, তার বড় অংশই আসে ইরান থেকে। অর্থাৎ, বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইরান বিতর্কিত হলেও, নির্দিষ্ট পণ্যবাজারে তার জায়গা এখনও দৃঢ়।
ভেতরের বাজার শক্তিশালী করার চেষ্টা
দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা একটি দেশের জন্য কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত ফলও বয়ে আনে—সেটি হলো ভেতরের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর চাপ। ইরানের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছে। দেশটি অটোমোবাইল, ইস্পাত, লোহা, ইলেকট্রনিকস, ওষুধ এবং খাদ্যপণ্য উৎপাদনে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডের সেন্টার ফর গ্লোবাল বিজনেস-এর ডিরেক্টর কিসলয় প্রসাদের ভাষায়, স্বনির্ভর হওয়ার জন্য তারা সুসংহত প্রচেষ্টা চালিয়েছে।
তবে এই জায়গায় একটি বড় সীমাবদ্ধতাও আছে। উৎপাদনশীল অর্থনীতি দাঁড় করাতে যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং আধুনিক শিল্প-উপকরণ লাগে। নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব আমদানি করা ইরানের জন্য কঠিন। ফলে স্বনির্ভরতার প্রচেষ্টা থাকলেও তা সব সময় দক্ষ, সস্তা বা প্রতিযোগিতামূলক হয়নি। অর্থাৎ, দেশটি বেঁচে থাকার মতো উৎপাদনক্ষমতা তৈরি করেছে, কিন্তু সেটি সবক্ষেত্রে উচ্চমানের শিল্পোন্নয়ন নয়।
এখানে আবারও বাণিজ্য অংশীদারদের বদল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েও ইরানের মোট আমদানির অর্ধেকের বেশি আসত ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে। এখন তা কমে ২০ শতাংশের নিচে নেমেছে। তার বদলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, ব্রাজিলের মতো দেশের গুরুত্ব বেড়েছে। বর্তমানে আমিরাত থেকে আসে ইলেকট্রনিকস, ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ চাল, আর ব্রাজিল থেকে সয়াবিন ও ভুট্টা।
এই রূপান্তরটি কেবল বাণিজ্যমানচিত্রের পরিবর্তন নয়; এটি দেখায় যে, পশ্চিমা সরবরাহশৃঙ্খল বন্ধ হয়ে গেলেও বিকল্প সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তোলা সম্ভব—যদিও সেই প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল, ধীর এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
যুদ্ধ নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে
ইরানের অর্থনীতি যতই অভিযোজনক্ষম হোক, সামরিক সংঘাত সেই সক্ষমতাকে বড় ধাক্কা দিতে পারে। আপনার দেওয়া পাঠ্যে উল্লেখ আছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের সামনে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলি ও মার্কিন মিসাইল হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, কারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সেনাঘাঁটির মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বর্তমানে দু-সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চললেও তা দীর্ঘস্থায়ী না হলে সামনে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য আছে। হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য একদিকে কৌশলগত শক্তি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ঝুঁকিও। কারণ এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত করা সম্ভব হলেও, একই সঙ্গে ইরানের নিজস্ব বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রণালিটি ইরানের হাতে একধরনের চাপ প্রয়োগের অস্ত্র, কিন্তু সেটি ব্যবহার করতে গেলে নিজের অর্থনীতিকেও মূল্য দিতে হয়।
ইরানের শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায়
এই পুরো চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানের অর্থনীতি কয়েকটি নির্দিষ্ট শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথম শক্তি, অভিযোজনক্ষমতা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটি নতুন অংশীদার, নতুন বাজার, নতুন মুদ্রা এবং নতুন লেনদেন পদ্ধতি খুঁজে নিয়েছে।
দ্বিতীয় শক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য। তেল এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অর্থনীতি আর পুরোপুরি তেলের বন্দি নয়।
তৃতীয় শক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান। আঞ্চলিক বাণিজ্য, সীমান্ত সংযোগ ও হরমুজ—সব মিলিয়ে ইরানকে উপেক্ষা করা কঠিন।
চতুর্থ শক্তি, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা।
কিন্তু দুর্বলতাও কম নয়।
প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং জনঅসন্তোষ অর্থনীতির ভেতরের চাপকে বাড়িয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, ছায়া-বাণিজ্য ও অস্বচ্ছ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
তৃতীয়ত, উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে বাধা শিল্পোন্নয়নকে সীমিত করে।
চতুর্থত, যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইরানের সমস্ত অভিযোজনকৌশলকে দ্রুত দুর্বল করে দিতে পারে।
অর্থাৎ, ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়েনি—কিন্তু সেটি স্বস্তিতে আছে, এমনও নয়। বরং একে বলা যায় “চাপের ভেতর চলমান অর্থনীতি”—যেখানে প্রতিদিনই টিকে থাকার নতুন হিসাব কষতে হয়।
ভবিষ্যৎ কোন পথে যেতে পারে?
সামনের পথ ইরানের জন্য সহজ নয়। যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকে এবং সংঘাত আরও বাড়ে, তাহলে যুদ্ধের ক্ষত সারিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। বিশেষ করে ঘরবাড়ি, স্কুল, কারখানা, গবেষণাগার, পরিবহন কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠনকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল করে তুলবে।
তেহরান যেকোনো চুক্তির শর্ত হিসেবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। কারণ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে। কিন্তু অন্যদিকে, ইরানও হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব খাটিয়ে দেখাচ্ছে যে বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো সক্ষমতা তারও আছে। এই দ্বিমুখী বাস্তবতাই ইরানকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একই সঙ্গে দুর্বল এবং শক্তিশালী—দুই রূপেই হাজির করে।
ইরানের অর্থনীতির গল্প মূলত “জয়” বা “পরাজয়”-এর গল্প নয়। এটি একধরনের দীর্ঘস্থায়ী মানিয়ে নেওয়ার ইতিহাস। প্রায় ৫০ বছরের একঘরে অবস্থা, কঠোর নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক অবরোধ, বাণিজ্যিক চাপ, এমনকি সাম্প্রতিক যুদ্ধ—সবকিছুর পরও ৯ কোটি ৪০ লাখ মানুষের এই দেশটি অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে পড়তে দেয়নি।
এটি যেমন ইরানের কৌশলগত সাফল্যের গল্প, তেমনি বিশ্বব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার গল্পও। কারণ শক্তিধর দেশগুলো চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল আদায় করতে পারে না। আর নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য যতই কঠোর হোক, বাস্তব অর্থনীতিতে সবসময়ই বিকল্প পথ তৈরি হয়—কখনও প্রকাশ্যে, কখনও অন্ধকারে।
ইরান সেই বিকল্প পথের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। প্রশ্ন এখন আর শুধু এই নয় যে, ইরান কতদিন টিকবে। বরং প্রশ্ন হলো, এই টিকে থাকা কি ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক মডেলে রূপ নেবে, নাকি যুদ্ধ, অবরোধ ও অভ্যন্তরীণ চাপের ভারে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে যাবে দেশটি।

