ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আরোপের পর এই জলপথ ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হয়েছে। এর মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে অচল বা কঠোর নিয়ন্ত্রণাধীন অবস্থায় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বুঝতে হলে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব মনে রাখতে হবে। সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় পাঁচ ভাগের একভাগ এই সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, শিপিং খরচ, বীমা ঝুঁকি এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবু যুদ্ধের উত্তাপ, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং অবরোধের হুমকির মাঝেও কয়েকটি দেশের তেলবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স গন্তব্য ও জাহাজ-তথ্যের ভিত্তিতে এদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বোঝা যাচ্ছে, বিশ্ববাজারের জ্বালানি চাহিদা এতটাই প্রবল যে সম্পূর্ণ ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া অনেক দেশের পক্ষেই সম্ভব হয়নি।
মালয়েশিয়া: অনুমোদিত সীমিত চলাচলের একটি বড় উদাহরণ
যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে হরমুজ অতিক্রমকারী দেশগুলোর তালিকায় মালয়েশিয়ার নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি) ‘সেরিফোস’ ১০ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবেশ করে এবং পরে আবার বেরিয়ে যায়। জাহাজটি ইরানের লারাক দ্বীপকেও পাশ কাটিয়ে যায়। মার্চের শুরুতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল বোঝাই করা এই ট্যাঙ্কারটির ২১ এপ্রিল মালয়েশিয়ার মালাক্কা বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। ‘ওশান থান্ডার’ নামের আরেকটি জাহাজ, যা ইরাকি অপরিশোধিত তেল বহন করছিল এবং মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের একটি ইউনিটের মাধ্যমে চার্টার করা হয়েছিল, ৫ এপ্রিল এই জলপথ অতিক্রম করে। ১৮ এপ্রিল মালয়েশিয়ার পেঙ্গেরাংয়ে জাহাজটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল খালাস করার কথা রয়েছে।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই দুটি ট্যাঙ্কার মালয়েশিয়ার এমন সাতটি জাহাজের মধ্যে রয়েছে, যারা ইরানের অনুমোদন পেয়ে প্রণালিটি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। এর অর্থ হলো, শুধু বাণিজ্যিক সক্ষমতা নয়, এই সংকটে কূটনৈতিক সমন্বয়ও জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করছে।
চীন: সরবরাহ চেইন সচল রাখতে কৌশলী অবস্থান
চীনও হরমুজ-পরবর্তী চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। চীনের পতাকাবাহী ভিএলসিসি ‘কসপার্ল লেক’ এবং ‘হে রং হাই’ ১১ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি ত্যাগ করে। এর মধ্যে ইরাকি তেল বোঝাই ‘কসপার্ল লেক’ ১ মে চীনের ঝৌশান বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। অন্যদিকে ‘হে রং হাই’ সৌদি তেল নিয়ে মিয়ানমারের দিকে যাচ্ছে।
এই দুটি ভিএলসিসিই চীনা জ্বালানি জায়ান্ট সিনোপেকের ট্রেডিং শাখা ইউনিপেকের মাধ্যমে চার্টার করা হয়েছে। আবার ২ এপ্রিল প্রণালি অতিক্রম করা ভিএলসিসি ‘ধালকুট’ ২২ এপ্রিল সৌদি তেল খালাস করতে মিয়ানমারের দিকে যাচ্ছে বলে ক্লেপলারের তথ্য বলছে। মিয়ানমারে খালাস করা তেল সাধারণত পেট্রোচায়নার ইউনান শোধনাগারে পাঠানো হয়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র ৩১ মার্চ জানিয়েছিলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের পর সম্প্রতি তিনটি চীনা জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, চীন শুধু বাজারের বড় ক্রেতা হিসেবেই নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ রুটে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিক থেকেও সক্রিয়।
ভারত: বহুমুখী জ্বালানি চাহিদার কারণে ঝুঁকি নিয়েও চলাচল
ভারতীয় প্রেক্ষাপট আরও বিস্তৃত। মার্চ ও এপ্রিল মাসে অন্তত দুটি ভিএলসিসি এবং দুটি সুয়েজম্যাক্স ট্যাঙ্কার উপসাগর ত্যাগ করে ভারতে তেল খালাস করতে গেছে। ২ এপ্রিল প্রণালি অতিক্রম করা ভিএলসিসি ‘হাবরুট’ ১৫ এপ্রিল ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের জন্য আবুধাবির তেল খালাস করতে প্যারাদীপের দিকে যাচ্ছে।
ক্লেপলারের তথ্য বলছে, ভিএলসিসি ‘মারাঠি’ ২৮ মার্চ রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জন্য সিক্কা বন্দরে সৌদি তেল খালাস করেছে। একইভাবে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘স্মিরনি’ সুয়েজম্যাক্স ট্যাঙ্কার ১২ মার্চ প্রণালি ত্যাগ করে এবং ১৬ মার্চ রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের জন্য মুম্বাইয়ে ১০ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল খালাস করে। আরেকটি সুয়েজম্যাক্স ‘শেনলং’ ৬ মার্চ প্রণালি ত্যাগ করে ১১ মার্চ মুম্বাইয়ে একই পরিমাণ সৌদি তেল খালাস করে।
ভারতের দিকে শুধু অপরিশোধিত তেলই নয়, জ্বালানি তেলও গেছে। ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাবনের পতাকাবাহী ‘এমএসজি’ ট্যাঙ্কার অবশিষ্ট জ্বালানি তেল নিয়ে ৯ এপ্রিল প্রণালি অতিক্রম করার পর ভারতের পিপাভাভ বন্দরের দিকে যাচ্ছে। লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘নাভারা’ ৩১ মার্চ প্রণালি পাড়ি দিয়ে ৮ এপ্রিল সিক্কা বন্দরে জ্বালানি তেল খালাস করেছে।
এ ছাড়া মার্চের শেষ দিকে সরকার জানায়, প্রায় ৯৪ হাজার মেট্রিক টন রান্নার গ্যাস বহনকারী ভারতগামী দুটি এলপিজি ট্যাঙ্কার নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ভারতের দিকে যাচ্ছে। ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ‘বিডব্লিউ টায়ার’ ৫ থেকে ৭ এপ্রিলের মধ্যে মুম্বাই ও পিপাভাভে খালাস করে, আর ‘বিডব্লিউ এলম’ ৬ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ভারতের তিনটি বন্দরে খালাস সম্পন্ন করে।
এর আগেও ‘শিবালিক’, ‘নন্দা দেবী’, ‘পাইন গ্যাস’ এবং ‘জগ বসন্ত’ নামের আরও চারটি ভারতীয় পতাকাবাহী এলপিজি ট্যাঙ্কার এই প্রণালি অতিক্রম করেছে। এসব তথ্য প্রমাণ করে, ভারতের মতো বড় জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথ খোঁজা সহজ নয়। ফলে উচ্চ ঝুঁকি সত্ত্বেও সরবরাহ চেইন চালু রাখা তাদের জন্য প্রায় বাধ্যতামূলক।
পাকিস্তান: সীমিত পরিসরে হলেও সক্রিয় উপস্থিতি
পাকিস্তানও এই শিপিং চলাচলে অংশ নিয়েছে। পাকিস্তানের পতাকাবাহী দুটি ট্যাঙ্কার ১২ এপ্রিল উপসাগরে প্রবেশ করে। তথ্য অনুযায়ী, আফ্রাম্যাক্স ট্যাঙ্কার ‘শালামার দাস’ তেল বোঝাই করতে সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে যাচ্ছে। আর প্যানাম্যাক্স আকারের ‘খায়রপুর’ পরিশোধিত পণ্য বোঝাই করতে কুয়েতের দিকে যাচ্ছে।
এ ছাড়া আফ্রাম্যাক্স ট্যাঙ্কার ‘পি. আলিকি’ ২৮ মার্চ প্রণালি অতিক্রম করে এবং ৩১ মার্চ করাচিতে সৌদি তেল খালাস করে। পাকিস্তানের জন্য এ ধরনের যাতায়াত কেবল বাণিজ্যিক নয়, জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা রক্ষারও অংশ। কারণ আঞ্চলিক অস্থিরতায় আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি দ্রুত চাপের মুখে পড়ে।
থাইল্যান্ড: কূটনৈতিক সমন্বয়ে নিরাপদ পারাপার
থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায়, কূটনৈতিক যোগাযোগ এখানে বড় ধরনের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। থাইল্যান্ড ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয়ের ফলে ব্যাংচাক কর্পোরেশনের মালিকানাধীন একটি থাই তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে এবং অবরোধ এড়াতে কোনো অর্থ দিতে হয়নি—এ তথ্য ২৫ মার্চ এক থাই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সুয়েজম্যাক্স ট্যাঙ্কার ‘পোলা’ থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে ১০ লাখ ব্যারেল খাফজি তেল খালাস করেছে। এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে শুধুমাত্র সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়, কখনও কখনও লক্ষ্যভিত্তিক কূটনৈতিক সংলাপও সংকটময় শিপিং রুটে বাস্তব ফল দিতে পারে।
কেন এই জাহাজ চলাচল এত তাৎপর্যপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি দিয়ে কারা চলেছে, সেটি শুধু একটি তালিকা নয়; এটি বর্তমান বিশ্ব জ্বালানি-রাজনীতির বাস্তব চিত্র। একদিকে যুদ্ধ, অবরোধ, হামলার আশঙ্কা এবং বীমা ব্যয় বৃদ্ধি—অন্যদিকে অপরিবর্তিত জ্বালানি চাহিদা। এই দুইয়ের সংঘাতে দেখা যাচ্ছে, কিছু দেশ এবং কিছু কোম্পানি ঝুঁকি হিসেব করে হলেও সরবরাহ বন্ধ করতে রাজি নয়।
এখানে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, কৌশলগত প্রশ্ন। চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান বা থাইল্যান্ড—সবার ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, তাদের শিপিং সিদ্ধান্তের পেছনে জাতীয় প্রয়োজন, পরিশোধন সক্ষমতা, আমদানি-নির্ভরতা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ কাজ করছে।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও ‘স্বাভাবিক’ নেই। সীমিত অনুমোদন, নির্দিষ্ট জাহাজের চলাচল, রুট পর্যবেক্ষণ এবং গন্তব্যভিত্তিক হিসাব—এসবই ইঙ্গিত দেয় যে এই রুট এখন আর মুক্ত বাণিজ্যের স্বাভাবিক করিডর নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।
তৃতীয়ত, জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এখন সরাসরি ভূরাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। যেকোনো সময় যদি হরমুজে চলাচল আরও কঠোরভাবে ব্যাহত হয়, তবে শুধু তেলের দাম নয়, গ্যাস, শিপিং ফ্রেইট, বীমা এবং এশিয়ার শিল্পোৎপাদন পর্যন্ত চাপের মুখে পড়তে পারে।
যুদ্ধের ছায়ায় ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমান তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরও হরমুজে চলাচল পুরোপুরি থেমে যায়নি। তবে এটি যে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশে চলছে, এমনও নয়। বরং প্রতিটি যাত্রা এখন হয়ে উঠছে কূটনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং জ্বালানি প্রয়োজনের এক জটিল সমীকরণ।
যেসব দেশ হরমুজ অতিক্রম করছে, তারা আসলে বিশ্বকে একটি বার্তা দিচ্ছে—জ্বালানি সরবরাহ এমন একটি বাস্তবতা, যা যুদ্ধের মধ্যেও থামে না; শুধু আরও ব্যয়বহুল, আরও ঝুঁকিপূর্ণ এবং আরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। হরমুজের বর্তমান চিত্র তাই কেবল সমুদ্রপথের সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, বাজারের নির্ভরতা এবং কৌশলগত টিকে থাকার পরীক্ষাও।

