মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নতুন কিছু নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ঘিরে যে কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা অনেককেই বিস্মিত করেছে। যেটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে, তা হলো—পাকিস্তান দ্রুত এমন এক অবস্থানে পৌঁছে গেছে, যেখানে তাকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় শক্তিগুলোর মধ্যে কার্যকর বার্তাবাহক ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে ভারত, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান জোরালো করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, এই সংকটে অপেক্ষাকৃত নীরব এবং প্রান্তিক ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে: কেন পাকিস্তান এখন এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ সেতু, আর ভারত নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা। সংঘাতের শুরুতেই ইসলামাবাদ অপেক্ষা করেনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা নিজেদের এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে হাজির করতে পেরেছে, যে একসঙ্গে ওয়াশিংটন, তেহরান, রিয়াদ ও দোহার সঙ্গে কথা বলতে পারে। এই সক্ষমতা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ ও জটিল সম্পর্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা, এবং আঞ্চলিক গোয়েন্দা যোগাযোগ—সব মিলিয়ে তারা এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, যেখান থেকে সংকটের মুহূর্তে দ্রুত ভূমিকা নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের এই উত্থান আংশিকভাবে ঘটনাচক্রে শুরু হলেও পরে তা সচেতন কৌশলে রূপ নেয়। ইরান অতীতে পাকিস্তানের ভেতরে সুন্নি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও চালিয়েছিল। অর্থাৎ দুই দেশের সম্পর্ক কখনোই সরল বা একমাত্রিক ছিল না। কিন্তু ঠিক এই জটিলতাই পাকিস্তানকে একটি কার্যকর যোগাযোগপথে পরিণত করেছে। কারণ, যাদের সম্পর্ক একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়, আবার পুরোপুরি বিশ্বাসভিত্তিকও নয়—তাদের মধ্যে বার্তা আদানপ্রদানের জন্য প্রায়ই তৃতীয় ধরনের বাস্তববাদী ব্যবস্থা তৈরি হয়। পাকিস্তান সেটিই কাজে লাগিয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাকিস্তান শুধু অবস্থানগত সুবিধা নেয়নি; তারা গতি দেখিয়েছে। সংঘাতের প্রথম দিকেই দেশটির সামরিক নেতৃত্ব, যারা কার্যত পররাষ্ট্রনীতির ওপর বড় প্রভাব রাখে, পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে ইসলামাবাদ আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সহায়তা করতে প্রস্তুত। এই স্পষ্ট বার্তা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তেহরানের সঙ্গে প্রকাশ্যে যোগাযোগ করতে অনাগ্রহী বা সতর্ক থাকলে, এমন একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজন পড়ে, যে একদিকে বার্তা পৌঁছে দিতে পারে, অন্যদিকে পরিস্থিতির ব্যাখ্যাও দিতে পারে। পাকিস্তান সেই প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেছে।
এখানেই ভারতের সঙ্গে তুলনাটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রশ্নে নয়াদিল্লি খুবই সতর্ক, সংযত এবং নিচু স্বরের কূটনীতি বেছে নিয়েছে। লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, ভারতের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ছিল, আর সেই কারণেই তারা এই সংকটে স্বাধীন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতীয় জলসীমার ঠিক বাইরে ইরানি ফ্রিগেট ‘আইরিস দেনা’ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ভারতের সংযত প্রতিক্রিয়াকে এই প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে।
তবে ভারতের এই অবস্থানকে কেবল দুর্বলতা বললে পুরো চিত্র ধরা হবে না। ভারতের কৌশল অনেক সময় হিসাবি নীরবতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তারা সাধারণত এমন ভূমিকায় যেতে চায় না, যেখানে ব্যর্থ হলে বড় কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় শুধু শক্তিশালী হওয়া যথেষ্ট নয়; দৃশ্যমান হওয়াও জরুরি। পাকিস্তান এখানে দৃশ্যমান হয়েছে, ভারত হয়নি। ফলে বৈশ্বিক আলোচনায় পাকিস্তানকে দরকারি রাষ্ট্র হিসেবে দেখা গেছে, আর ভারতকে অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী পর্যবেক্ষক হিসেবে।
এই পার্থক্যের আরেকটি গভীর কারণ রয়েছে—রাষ্ট্রযন্ত্রের গতি ও বার্তার ঐক্য। পাকিস্তানের সামরিক-প্রভাবিত শাসনকাঠামো দ্রুত, কেন্দ্রীভূত এবং একরৈখিক বার্তা তৈরি করতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু সংকটকালে তাৎক্ষণিক বার্তা দেওয়ার সুবিধা থাকে। ভারতীয় ব্যবস্থা তুলনায় বেশি আমলাতান্ত্রিক, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। ফলে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে, ভাষা হয় পরিমিত, আর বার্তা প্রায়ই আক্রমণাত্মক নয়, প্রতিরক্ষামূলক শোনায়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করের “ভারত কোনো দালাল রাষ্ট্র নয়” ধরনের প্রতিক্রিয়া এই অস্বস্তির ইঙ্গিত বহন করে। এতে কৌশলগত আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বিরক্তির সুর বেশি ধরা পড়ে।
পাকিস্তানের এই সাফল্য অবশ্য বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং প্রয়োজনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটিই আসল কথা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় নৈতিকতা, অতীত রেকর্ড বা নীতিগত স্থিরতার চেয়ে অনেক সময় বেশি মূল্য পায় তাৎক্ষণিক উপযোগিতা। পাকিস্তানের ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। শীতল যুদ্ধের সময়, পরে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সময়ও, তারা নিজেদের অপরিহার্য মিত্র হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিল। এর বিনিময়ে বহু বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেয়েছে, যদিও একই সঙ্গে দ্বৈত খেলার অভিযোগ থেকেও মুক্ত ছিল না। ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ থেকে শুরু করে ভারত ও আফগানিস্তানে জঙ্গি গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতার সমালোচনা—সবকিছুর মাঝেও পাকিস্তান প্রায়ই নিজেকে সন্ত্রাসবাদের শিকার রাষ্ট্র হিসেবেও তুলে ধরেছে। এই দ্বৈত বয়ান তৈরিতে তারা দক্ষ।
ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রেও সেই পুরোনো কৌশলের নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। একদিকে তারা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগের পথ খুলে দিতে আগ্রহী, অন্যদিকে আফগানিস্তানে তাদের সামরিক তৎপরতা বেড়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি একটি মাদক পুনর্বাসন হাসপাতালে হামলায় শত শত মানুষের মৃত্যুর অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই রাষ্ট্র একদিকে আগুন নেভানোর কথা বলছে, অন্যদিকে অন্য ফ্রন্টে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বাইরে থেকে এটি দ্বিচারিতা মনে হতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানের কৌশল বোঝার জন্য এটিকে পরস্পরবিরোধিতা নয়, বরং বহুস্তরীয় চাপ সৃষ্টি ও দর-কষাকষির রাজনীতি হিসেবে দেখা দরকার।
এখানে ভারতের জন্য শিক্ষাও রয়েছে। সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক ওজন এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও, কূটনৈতিক পরিসরে প্রভাব তৈরি করতে হলে শুধু শক্তি নয়, সঠিক সময়ে সক্রিয় উপস্থিতিও দরকার। গত বছরের তিন দিনের ‘অভিযান সিঁদুর’-এ পাকিস্তানের ভেতরে জঙ্গি অবকাঠামো লক্ষ্য করে সামরিক সাফল্য দেখানোর পরও ভারত বৈশ্বিক বয়ান নিয়ন্ত্রণে পিছিয়ে পড়েছে—এই অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে জয় আর কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব—দুইটি সব সময় এক জিনিস নয়।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানের বর্তমান উত্থানকে স্থায়ী সাফল্য বলা এখনও তাড়াহুড়ো হবে। দেশটি অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর, একাধিক ফ্রন্টে অতিরিক্ত সক্রিয়, এবং বড় শক্তিগুলোর অস্থির নীতির ওপর আংশিকভাবে নির্ভরশীল। উপরন্তু, ইরানের প্রকাশ্য অস্বীকৃতি পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে। তবু বর্তমান মুহূর্তে পাকিস্তান একটি জিনিস অর্জন করেছে—বিশ্বাস নয়, প্রয়োজনীয়তা। আর আজকের ভূরাজনীতিতে বহু সময় বিশ্বাসের চেয়ে প্রয়োজনীয়তার মূল্যই বেশি।
এই কারণেই ইরান যুদ্ধের কূটনৈতিক মানচিত্রে পাকিস্তান সামনে এসেছে, ভারত নয়। পাকিস্তান নিজেকে অপরিহার্য করে তুলতে পেরেছে; ভারত নিজেকে সংযত রেখেছে। একজন দৃশ্যমান, অন্যজন সতর্ক। একজন ঝুঁকি নিয়েছে, অন্যজন দূরত্ব বজায় রেখেছে। এখন প্রশ্ন হলো, দীর্ঘমেয়াদে কোন পথ বেশি ফল দেবে—দরকারের বন্ধু হওয়া, নাকি নীরব শক্তি হয়ে থাকা? বর্তমান মুহূর্তে অন্তত উত্তরটি পাকিস্তানের পক্ষেই যাচ্ছে।

