যুদ্ধবিরতি সাধারণত সংঘাত থামার একটি বিরতি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় এই বিরতিই হয়ে ওঠে পরবর্তী সংঘর্ষের প্রস্তুতির সময়। ইরানের সাম্প্রতিক কার্যক্রম ঠিক সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ তুলে ধরছে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মাঝখানে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির সময়টিকে কাজে লাগিয়ে ইরান তাদের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো আবার সক্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যেসব ঘাঁটির প্রবেশপথ আগে হামলা করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, এখন সেগুলো ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরিষ্কার করা হচ্ছে।

এপ্রিলের ১০ তারিখে তোলা একটি স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির প্রবেশপথে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ সরাতে বড় ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। কাছেই অপেক্ষা করছে ট্রাক, যেগুলোতে সেই ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই দিনে অন্য একটি এলাকায়ও নির্মাণকাজ চলার প্রমাণ মিলেছে।
এই দৃশ্যগুলো শুধু পুনর্গঠন নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে কৌশল নিয়েছিল, তা ছিল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরাসরি ধ্বংস না করে তাদের ভূগর্ভেই আটকে ফেলা। প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দিলে সেগুলো ব্যবহার অক্ষম হয়ে পড়ে।
মার্কিন সূত্র বলছে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনো অক্ষত রয়েছে। যদিও প্রথম পাঁচ সপ্তাহে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তবুও পুরো সক্ষমতা ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
এখানেই ইরানের কৌশলগত শক্তির একটি দিক স্পষ্ট হয়। তাদের অনেক অস্ত্র ও অবকাঠামো মাটির গভীরে নির্মিত, যা প্রথম ধাক্কা সামলে আবার দ্রুত সচল হওয়ার জন্যই পরিকল্পিত। এই ধারণাটিকেই বলা হয় ‘মিসাইল সিটি’—একটি ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক, যেখানে হামলার পরও কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা যায়।

অনেক মার্কিন বিশ্লেষকই এখন আশঙ্কা করছেন, এই যুদ্ধবিরতিই ইরানের জন্য পুনর্গঠনের সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সরাসরি সংঘর্ষ না থাকলে নজরদারি কিছুটা শিথিল হয়, আর সেই সময়েই ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। বরং ইরানের সামরিক নীতির সঙ্গেই এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রথম আঘাত সহ্য করে, দ্রুত ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং আবার পাল্টা সক্ষমতা তৈরি করা—এই ধারণার ওপরই তাদের প্রতিরক্ষা কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।
এখানেই শেষ নয়। মার্কিন মহলে আরও একটি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে—ইরান হয়তো তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বাইরের উৎস, বিশেষ করে রাশিয়ার কাছ থেকে নতুন প্রযুক্তি বা অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।
এই সম্ভাবনা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ, যদি ইরান দ্রুত তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে বা আরও উন্নত করে, তাহলে ভবিষ্যতের সংঘর্ষ আরও তীব্র হতে পারে।
অন্যদিকে, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুদ্ধ শেষের দিকে এবং খুব শিগগিরই নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। অর্থাৎ, একদিকে যেমন মাটির নিচে সামরিক প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে টেবিলে চলছে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
এই দ্বৈত বাস্তবতা—যুদ্ধ ও আলোচনার সমান্তরাল অগ্রগতি—বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

