জেরুজালেমকে ঘিরে সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘ। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে মনে হয়, এখন লড়াই শুধু জমি নিয়ে নয়; এই লড়াই শহরটির আত্মা, স্মৃতি, ধর্মীয় অধিকার এবং ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়েও। পবিত্র স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে যা ঘটছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে মনে করলে ভুল হবে। বরং এর ভেতরে আছে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা, যার লক্ষ্য জেরুজালেমের মুসলিম ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় জীবনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
ঘटनাপ্রবাহটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে পবিত্র শনিবারকে ঘিরে। ওই দিন ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানরা যখন জেরুজালেমের পুনরুত্থান গির্জায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন তাদের ওপর ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর হামলা ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ ওঠে। ঠিক পরদিন, অর্থডক্স ইস্টারের সময়, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং তার সমর্থকেরা আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন এবং সেখানে প্রার্থনা করেন, যদিও ওই স্থানে অমুসলিম ধর্মীয় আচার পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে ধরা হয়ে এসেছে।
এই দুই ঘটনা একসঙ্গে রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে: এখানে কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নেই, আছে কর্তৃত্বের প্রশ্ন। কে কোথায় যাবে, কে প্রার্থনা করবে, কার উপস্থিতি বৈধ ধরা হবে, আর কার উপস্থিতি নিয়ন্ত্রিত হবে—জেরুজালেমের সংকট এখন অনেকটাই এই প্রশ্নগুলোর চারপাশে ঘুরছে।
পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয় যখন আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ এবং পুনরুত্থান গির্জা—দুটিই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের সময় “নিরাপত্তা”র অজুহাতে টানা ৪০ দিন বন্ধ রাখা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এর ফলে আল-আকসায় শুক্রবারের নামাজ এবং ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়নি। একই সময় পাম সানডের দিনে জেরুজালেমের লাতিন প্যাট্রিয়ার্ক কার্ডিনাল পিয়েরবাত্তিস্তা পিৎসাবাল্লা এবং অন্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদেরও পুনরুত্থান গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা পরিচালনা করতে বাধা দেওয়া হয়। এই ঘটনাগুলো কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়; এগুলো দেখায়, ধর্মীয় জীবনের ছন্দ কে ঠিক করবে—সেই ক্ষমতার লড়াই কতটা গভীরে পৌঁছে গেছে।
এখানে যে ধারণাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো বহু শতাব্দী ধরে চালু থাকা সেই ঐতিহাসিক ব্যবস্থা, যাকে সাধারণভাবে “বিদ্যমান ধর্মীয় রীতি-ব্যবস্থা” বলা যায়। জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর ধর্মীয় কর্তৃত্ব, ব্যবহার, প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভূমিকা এই ব্যবস্থার ভিত্তিতেই দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত হয়ে এসেছে। এর শিকড় ১৬শ শতক পর্যন্ত পৌঁছে যায়, উসমানীয় আমলে। পরে ১৮৫৬ সালের প্যারিস চুক্তি এবং ১৮৭৮ সালের বার্লিন চুক্তিতেও এই ব্যবস্থার স্বীকৃতি মেলে। অর্থাৎ এটি কোনো অস্পষ্ট বা অনানুষ্ঠানিক রেওয়াজ নয়; বরং বহুদিনের ইতিহাস, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং স্বীকৃত অধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠিত কাঠামো।
১৯১৭ সালে বালফুর ঘোষণা জারির সময়ও এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল, এবং ব্রিটিশ শাসনামলেও তা বজায় রাখা হয়েছিল। পরে ফিলিস্তিন বিভাজন নিয়ে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের সময় জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে বিশেষ আন্তর্জাতিক মর্যাদার আওতায় রাখার যে চিন্তা সামনে আসে, তার পেছনেও ছিল এই সংবেদনশীল ধর্মীয় ভারসাম্য রক্ষা করার লক্ষ্য। সেই ব্যবস্থার একটি অংশ ছিল গির্জার সম্পত্তিকে করমুক্ত রাখা-সহ আরও কিছু ঐতিহাসিক সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখা।
১৯৪৮ সালের নাকবার পর, যখন জেরুজালেমের পশ্চিমাংশ থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা হয় এবং খ্রিষ্টান ফিলিস্তিনিরাও তাতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তখন জাতিসংঘে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নেও উপাসনার বিদ্যমান অধিকার বজায় রাখার প্রতিশ্রুতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ফ্রান্সের সঙ্গে হওয়া শোভেল-ফিশার সমঝোতাতেও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ ছিল। ফলে এই প্রশ্নটি কেবল ধর্মীয় আবেগের নয়; এটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
এখানেই আজকের বড় সংকট। সমালোচকদের মতে, ইসরায়েল এখন আর কেবল মাঝে মাঝে এই পুরোনো ধর্মীয় রীতি-ব্যবস্থা লঙ্ঘন করছে না; বরং ধীরে ধীরে এমন নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দিতে চাইছে, যার অধীনে মুসলিম ও খ্রিষ্টান উপাসনা সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের অধীন হবে। বাইরে থেকে “সবাইয়ের প্রবেশাধিকারের” ভাষা ব্যবহার করা হলেও, বাস্তবে সেটি সমঅধিকার নয়; বরং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক নতুন রূপ।
আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের উদাহরণই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে এর প্রশাসনিক দায়িত্ব ইসলামী ওয়াক্ফের হাতে থাকার কথা, এবং কে কখন সেখানে যাবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতাও তাদের। কিন্তু অভিযোগ হলো, “প্রবেশাধিকারের স্বাধীনতা”র নামে বহু সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারী সেখানে ঢুকছে, ধর্মীয় আচার পালন করছে, এবং ধীরে ধীরে জায়গাটিকে ইহুদি প্রার্থনার স্থান হিসেবেও তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এতে বোঝা যায়, যে ভাষা বাইরে থেকে স্বাধীনতার মতো শোনায়, বাস্তবে তা কর্তৃত্ব বিস্তারের হাতিয়ারও হতে পারে।
জেরুজালেমের প্রশ্নে আরেকটি গভীর দিক হলো শহরটির পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই। আলোচিত দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের শহরটির প্রাচীন ও স্বাভাবিক অধিকারসম্পন্ন জনগোষ্ঠী হিসেবে না দেখে কেবল “বাসিন্দা” হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা বাড়ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ঐতিহাসিক শিকড় এবং ধর্মীয় উত্তরাধিকারকে দুর্বল করে দেখানো সহজ হয়। জেরুজালেমকে যদি একান্তই একক ধর্মীয়-জাতীয় পরিচয়ের শহর হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলে, তাহলে মুসলিম ও খ্রিষ্টান উপস্থিতি সেখানে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নয়, বরং সীমিত সহনশীলতার বিষয় হিসেবে দেখা হবে।
এই কারণেই “উপাসনার স্বাধীনতা” কথাটি নিয়ে এত বিতর্ক। কাগজে-কলমে এই শব্দগুচ্ছ আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবে যদি পশ্চিম তীর বা গাজা পরিচয়পত্রধারী ফিলিস্তিনিরা খুব কমই অনুমতি পান, যদি জেরুজালেমে প্রবেশের জন্য তাদের বারবার প্রশাসনিক দেয়ালে ঠেকে যেতে হয়, তাহলে সেটিকে প্রকৃত স্বাধীনতা বলা কঠিন। এই সীমাবদ্ধতা শুধু সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে না; ধর্মীয় নেতারাও এর শিকার হন।
উদাহরণ হিসেবে ২০১১ সালে জেরুজালেমের অ্যাংলিকান বিশপ সুহাইল দাওয়ানির বসবাসের অনুমতি বাতিলের ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। একইভাবে এ বছর আল-আকসা মসজিদের ইমাম শেখ মোহাম্মদ আল-আবাসসিকে এক সপ্তাহের জন্য প্রাঙ্গণে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। যখন একটি শহরের ধর্মীয় নেতারাও নির্বিঘ্নে নিজেদের পবিত্র স্থানে যেতে পারেন না, তখন সেখানে উপাসনার স্বাধীনতা নিয়ে সরকারি ভাষ্য খুব সহজেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই বাস্তবতা থেকে আরও বড় একটি সত্য সামনে আসে। জেরুজালেমে পবিত্র স্থানগুলো এখন শুধু ধর্মীয় আচার পালনের জায়গা নয়; এগুলো সার্বভৌমত্বের প্রতীক, নিয়ন্ত্রণের ভাষা, এবং রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে। কখন গির্জা খুলবে, কখন মসজিদে নামাজ হবে, কার প্রবেশাধিকার থাকবে, কার থাকবে না—এসব সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হয়ে ওঠে, তবে শহরের আধ্যাত্মিক পরিবেশও স্বাভাবিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আন্তর্জাতিক ভূমিকার প্রশ্নেও স্পষ্ট দ্বৈততা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসন নিজেকে ধর্মীয় স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরলেও, ইসরায়েলে নিয়োগ দেওয়া দূতের অবস্থান বসতি স্থাপনকারীদের মতাদর্শের কাছাকাছি বলেই সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যা ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, কার্যকর জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ নিতে এড়িয়ে গেছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। আরব বিশ্বের সামনে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে প্রচারিত চুক্তিগুলোকেও সমালোচকেরা ফলহীন বলছেন, বিশেষ করে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতা ঠেকানোর প্রশ্নে।
তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। লাতিন প্যাট্রিয়ার্ককে পুনরুত্থান গির্জায় যেতে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বদলে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনা দেখায়, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া যদি জোরালো, দৃশ্যমান এবং ধারাবাহিক হয়, তাহলে তার বাস্তব প্রভাব পড়তে পারে। তাই কেবল উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়; প্রশ্ন হলো, বিশ্বশক্তিগুলো কি আসলেই এমন চাপ প্রয়োগে প্রস্তুত, যা মাটির বাস্তবতায় পরিবর্তন আনতে পারে।
সবচেয়ে শক্তিশালী সত্যটি সম্ভবত এখানেই: জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের জন্য উপাসনা এখন শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটি অস্তিত্ব রক্ষার এক নীরব ভাষা। তারা প্রকাশ্য সংঘাতে না গিয়েও, শান্তভাবে, নিয়মিত উপস্থিতির মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছেন—পবিত্র স্থান মানে শুধু দেয়াল, গম্বুজ বা পাথর নয়; এটি স্মৃতি, উত্তরাধিকার, সম্প্রদায় এবং নিজের শহরের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন।
এই কারণে জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কও কেবল বর্তমান সময়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড় প্রশ্ন হলো, শহরটি কি তার বহুধর্মীয় ঐতিহাসিক চরিত্র ধরে রাখতে পারবে, নাকি সেটিকে ধীরে ধীরে একক আধিপত্যের কাঠামোয় পুনর্লিখন করা হবে? যদি বহু শতাব্দীর সেই পুরোনো ধর্মীয় রীতি-ব্যবস্থা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ক্ষতি শুধু মুসলিম বা খ্রিষ্টানদেরই হবে না; ক্ষতি হবে জেরুজালেমের সেই ঐতিহাসিক স্বরূপের, যা বহু যুগ ধরে টানাপোড়েনের মাঝেও নানা সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বহন করে এসেছে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি একেবারেই স্পষ্ট: যে কোনো রাষ্ট্র যদি একদিকে পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক ভারসাম্যের প্রতি সমর্থন জানায়, আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ধারাবাহিক বাস্তবতাকে সহ্য করে, তবে সেই সমর্থন বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। জেরুজালেমের ধর্মীয় জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, প্রয়োজন বাস্তব সুরক্ষা, ঐতিহাসিক অধিকারের স্বীকৃতি, এবং এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থান, যা শহরটির বহুমাত্রিক পরিচয়কে অস্বীকার না করে বরং রক্ষা করে।
জেরুজালেম আজ তাই শুধু একটি শহরের নাম নয়। এটি এমন এক পরীক্ষাক্ষেত্র, যেখানে দেখা যাচ্ছে—ক্ষমতা কি ইতিহাসকে মুছে দিতে পারে, নাকি মানুষের নীরব উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত স্মৃতি ও অধিকারকে টিকিয়ে রাখে। আর এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, পবিত্র নগরীটি ভবিষ্যতে কার ভাষায়, কার স্মৃতিতে, এবং কার অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকবে।

