বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বিবিসি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। সেই চাপ সামাল দিতে এবার প্রায় ২ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ১৫ বছরের মধ্যে এটিই বিবিসির সবচেয়ে বড় গণছাঁটাই হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) এক সাধারণ সভায় কর্মীদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন মহাপরিচালক রদ্রি তালফান ডেভিস ই-মেইলের মাধ্যমে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। সেখানে তিনি জানান, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং লাইসেন্স ফি থেকে আয় কমে যাওয়ায় ব্যয় ও আয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী দুই বছরে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই ছাঁটাই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিবিসির নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। গুগলের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী ম্যাট ব্রিটিন আগামী ১৮ মে নতুন মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের আগেই এত বড় ছাঁটাই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগে বিদায়ী মহাপরিচালক টিম ডেভি গত ফেব্রুয়ারিতে ৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ধীরে ধীরে জনবল কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
আর্থিক চাপ কমাতে বিবিসি ইতোমধ্যেই বেশ কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন নিয়োগে কড়াকড়ি, ভ্রমণ ব্যয় কমানো, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের খরচ সীমিত করা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কনফারেন্সে অংশগ্রহণ কমিয়ে আনা—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে। একইসঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কাজের প্রক্রিয়া সহজ করার চেষ্টা চলছে।
এই সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দর্শকদের অভ্যাসের পরিবর্তন। গত এক বছরে প্রায় ৩ লাখ পরিবার বিবিসির লাইসেন্স ফি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ, এখন মানুষ ক্রমেই ঝুঁকছে নেটফ্লিক্স, ডিজনি প্লাস এবং ইউটিউব-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে। ফলে ঐতিহ্যবাহী সম্প্রচার মাধ্যমগুলো আগের মতো দর্শক ধরে রাখতে পারছে না।
মিডিয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকমও সতর্ক করে জানিয়েছে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ‘বিলুপ্তপ্রায়’ হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, কর্মীদের সংগঠন ‘বেক্টু’ এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির প্রধান ফিলিপা চাইল্ডস এই ছাঁটাইকে ‘বিধ্বংসী’ বলে উল্লেখ করে বলেন, বারবার কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে কর্মীদের ওপর চাপ বাড়ছে এবং এতে বিবিসির জনসেবামূলক লক্ষ্য পূরণের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সব মিলিয়ে, বিবিসির এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়—এটি বৈশ্বিক মিডিয়া শিল্পে চলমান পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং দর্শকদের অভ্যাসের বদল যে কতটা বড় প্রভাব ফেলছে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে এই গণছাঁটাই।

