ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয় বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেয়। এই সংঘাতের প্রভাব এতটাই গভীর যে তা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল প্রতিদিন পরিবহন করা হয়। কিন্তু প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে গত ৫০ দিনে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এই বিপর্যয়ের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংঘাতের সূত্রপাতের পর ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানে এবং কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে তেলের বৈশ্বিক সরবরাহে তাৎক্ষণিক ধাক্কা লাগে। পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে লেবাননের সংঘাত বন্ধ হলে প্রায় ৪৭ দিন পর প্রণালিটি আবার চালু হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানি বন্দর বন্ধের ঘোষণা আসার পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ইরান পুনরায় প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়।
এই সংকটের গভীরতা বোঝাতে বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যে পরিমাণ তেলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক মাসের চাহিদার সমান। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। যদি পর্যাপ্ত মজুদ না থাকে, তাহলে সড়কে যান চলাচল পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই বিপুল পরিমাণ তেল ইউরোপের এক মাসের বেশি সময়ের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এমনকি এটি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কয়েক বছরের জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফলে এই ঘাটতি শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়, বরং বাস্তব অর্থেই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি।
সংঘাতের প্রভাবে তেল উৎপাদন ও রপ্তানিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ছয়টি আরব দেশের তেল বিক্রি ২০৬ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি কমে গেছে। মার্চ মাসে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে পারেনি, যা বিশ্বের বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদনের সমান।
অন্যদিকে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিমানের জ্বালানি রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যেখানে ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল রপ্তানি হতো, সেখানে মার্চ ও এপ্রিল মাসে তা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ লাখ ব্যারেলে। এর ফলে বৈশ্বিক বিমান চলাচল এবং পরিবহন খাতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
এপ্রিল মাসে বিশ্বজুড়ে তেলের মজুদ প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ব্যারেল কমে গেছে এবং মার্চ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

