লেবাননে ইসরাইলি অভিযানের সর্বশেষ ধাপকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি—বরং অনেকের ভাষায় তা আরও অনিশ্চিত ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। অভিযানের নাম যাই হোক, মাটির মানুষের কাছে এর অর্থ একটাই: মৃত্যু, ধ্বংস, উদ্বাস্তু জীবন এবং অনিশ্চয়তায় ডুবে যাওয়া ভবিষ্যৎ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘অপারেশন ইটারনাল ডার্কনেস’ বা ‘অনন্ত অন্ধকার’ নামের অভিযানে মাত্র ১০ মিনিটে লেবাননের ১০০টিরও বেশি স্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৩০০ জন নিহত হয়েছেন এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন, একটি ভেঙে যাওয়া ঘর, আর একরাশ অন্ধকার।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হামলার পরিধি এবার আর কেবল নির্দিষ্ট কিছু এলাকা বা সামরিকভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অভিযোগ উঠেছে, ইসরাইল সাধারণত শিয়া-অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করলেও এবারের অভিযানে প্রায় গোটা লেবাননজুড়ে নির্বিচার বোমাবর্ষণের কৌশল নেওয়া হয়েছে। বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির কাছের আবাসিক এলাকা পর্যন্ত রেহাই পায়নি। অর্থাৎ, যুদ্ধ আর ফ্রন্টলাইনে সীমাবদ্ধ নেই; তা ঢুকে পড়েছে মানুষের বাসা, আশ্রয়, স্কুলপাড়া ও শহরের ভেতরকার নিরাপদ ভেবে থাকা জায়গাগুলোতেও।
বুধবার, ১৫ এপ্রিল, বৈরুতের একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় পাঁচ নারী ও এক শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা এই সংকটের নির্মমতাকে আরও স্পষ্ট করে। তাঁরা দক্ষিণ লেবাননের সংঘাত এড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের বিস্তার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ‘নিরাপদ আশ্রয়’ কথাটাই যেন অর্থহীন হয়ে পড়ছে। এক অঞ্চল থেকে পালিয়ে আরেক অঞ্চলে গিয়ে বাঁচার সুযোগও ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
এর মধ্যে ১৬ এপ্রিল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কথা সামনে এলেও মাটির পরিস্থিতি সেই ঘোষণার সঙ্গে মিলছে না। অভিযোগ রয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পরপরই দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রামে আবারও শেল হামলা হয়েছে। এই বাস্তবতা একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়: যুদ্ধবিরতি কি কেবল কূটনৈতিক ভাষা, নাকি সত্যিই তা মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ? যখন ঘোষণার পরও গোলা পড়ে, মানুষ মরে, ঘর ভাঙে—তখন যুদ্ধবিরতির বিশ্বাসযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই সন্দেহ একদিনে তৈরি হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির পরের সাত মাসেও ইসরাইলি হামলায় অন্তত ২৫০ জন লেবাননি নিহত হয়েছিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ থেকেই বোঝা যায় যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি বাস্তবে কখনোই দৃঢ়ভাবে মানা হয়নি। অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো আকস্মিক বিচ্যুতি নয়; বরং দীর্ঘদিনের এক অনিরসনযোগ্য সহিংস ধারাবাহিকতার নতুন বিস্ফোরণ।
চলমান সংঘাতের মানবিক মূল্যও ভয়াবহ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই বাস্তুচ্যুতি শুধু ঘরছাড়া হওয়া নয়; এর অর্থ জীবিকা হারানো, শিক্ষার ছন্দ ভেঙে যাওয়া, চিকিৎসা ব্যাহত হওয়া, শিশুর মানসিক আঘাত, এবং পুরো সমাজে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক হিসাবও হয়তো পুরো বাস্তবতা প্রকাশ করছে না।
বিশ্লেষকদের একাংশ এই হামলার ধরনকে গাজায় চালানো ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করছেন। এই তুলনার কেন্দ্রবিন্দু হলো সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে গিয়ে বিস্তৃত জনপদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, আতঙ্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ঠেলে দেওয়া। দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের ভূমি দখলের চেষ্টা এবং নিয়মিত আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ দেশটির সার্বভৌমত্ব নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি কেবল সীমান্ত সংঘর্ষ নয়; এটি লেবাননের ভৌগোলিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতি এবং সামাজিক ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাসও এই সংকটকে আরও ভারী করে তোলে। ১৯৭৮ এবং ১৯৮২ সালের স্মৃতি এখন আবার সামনে চলে এসেছে। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, লেবাননে বারবার এ ধরনের হামলার মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে—দেশটির সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য নষ্ট করা, ভয় ছড়িয়ে জনসংখ্যাকে স্থানচ্যুত করা, এবং ভেতর থেকে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেওয়া। ‘অনন্ত অন্ধকার’ নামটিও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতীকী হয়ে উঠেছে। নামটি যেন শুধু একটি সামরিক অভিযানকে বোঝায় না; বরং এটি এমন এক কৌশলের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবসাদকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলা হয়।
এ কারণেই এই অভিযানকে অনেকেই কেবল সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি মানসিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে ভর করে পরিচালিত এক ধরনের ভয়প্রদর্শনমূলক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আল জাজিরার কলামিস্ট ও লেখিকা বেলেন ফার্নান্দেজ এই হামলাকে ইসরাইলের ‘উন্মত্ত ধ্বংসলীলা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই মন্তব্য আসলে বৃহত্তর এক উদ্বেগকে তুলে ধরে—যখন সামরিক শক্তির প্রয়োগে সংযম থাকে না, তখন যুদ্ধক্ষেত্র ও সাধারণ জনজীবনের সীমারেখা দ্রুত মুছে যায়।
সব মিলিয়ে লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি দেশের সংকট নয়; এটি গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি। যুদ্ধবিরতি ঘোষণা যদি কার্যকর না হয়, আর বেসামরিক জনগোষ্ঠী যদি হামলার প্রধান শিকার হতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হামলা বন্ধ করা, বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতিকে কাগজের ঘোষণা থেকে বাস্তব মাটিতে নামিয়ে আনা। তা না হলে লেবাননের ওপর নেমে আসা এই অন্ধকার আরও দীর্ঘ, আরও গভীর, আরও ভয়াবহ হতে পারে।

