বিশ্বরাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে প্রায় প্রতিটি প্রশ্নই আবার নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—আমেরিকা কি আগের মতোই বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে চায়, নাকি সে নিজের ভেতরে গুটিয়ে যেতে চায়? আর এই প্রশ্নের আরও গভীরে গেলে সামনে আসে আরেকটি বিষয়: সাধারণ মার্কিন নাগরিক আসলে কী চান?
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে যত বিভাজন, ততটা ভাঙন সাধারণ মানুষের মধ্যে সবসময় দেখা যায় না। নীতি নির্ধারক, কৌশলবিদ আর দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে যদি জনমতের দিকে তাকানো হয়, তাহলে একটি জটিল কিন্তু স্পষ্ট বাস্তবতা চোখে পড়ে। মার্কিনিরা চায় তাদের দেশ বিশ্বমঞ্চে সক্রিয় থাকুক, প্রভাব রাখুক, নেতৃত্ব দিক। কিন্তু তারা একইসঙ্গে চায় এই নেতৃত্ব যেন সীমাহীন সামরিক হস্তক্ষেপে না গিয়ে বাস্তব সুফল বয়ে আনে—নিরাপত্তায়, অর্থনীতিতে এবং তাদের প্রতিদিনের জীবনে।
ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় তুলনামূলক সংযত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তার প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে আরও দৃশ্যমান হয়েছে প্রভাব বিস্তার, চাপ প্রয়োগ, লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি এবং একতরফা অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা। গবেষণা ও পররাষ্ট্র বিশ্লেষক মহলের মতে, এটি শুধু পুরোনো জাতীয়তাবাদের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং এমন এক নীতির রূপ, যা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বজায় রাখতে চায়, কিন্তু সেই উপস্থিতিকে সহযোগিতামূলক নয়, বরং বেশি জবরদস্তিমূলক করে তোলে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, এই নীতির সঙ্গে কি সাধারণ আমেরিকানের মনোভাব মেলে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)। ২০২৫ সালের শেষদিকে সংস্থাটি ২৯টি অঙ্গরাজ্যের ৩৩২ জন সাধারণ মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কথা বলে। অ্যারিজোনা, জর্জিয়া ও মিশিগান—এই তিন রাজ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা আটলান্টা, ডেট্রয়েট, ফিনিক্স ও ওয়াশিংটন ডিসিতে সরাসরি এবং অনলাইনে আলোচনায় অংশ নেন। এই আলোচনা, সঙ্গে বিভিন্ন জরিপের তথ্য, মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র সামনে আসে।
সক্রিয় আমেরিকা চাই, কিন্তু যুদ্ধক্লান্ত আমেরিকা নয়
মার্কিন নাগরিকদের চিন্তায় প্রথম যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, তা হলো—বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোপুরি সরে যাওয়া তারা সমর্থন করেন না। বরং তাদের বড় অংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে পিছু হটে, তাহলে চীনসহ অন্য স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির প্রভাব বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে শুধু ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যই বদলাবে না, বৈশ্বিক অর্থনীতিও অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা আছে। সক্রিয়তা চাওয়া মানে তারা অবিরাম যুদ্ধ বা বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জড়িত থাকার পক্ষে—এমন নয়। ইরাক, আফগানিস্তানসহ দীর্ঘ সংঘাতের অভিজ্ঞতা মার্কিন জনমনে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। তাই এখন অনেকেই মনে করেন, শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি মানে শুধু সেনা পাঠানো নয়; বরং এমন কূটনীতি, বাণিজ্যনীতি ও জোটনীতি, যা যুদ্ধ এড়িয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
এই অবস্থানকে দ্বিধাগ্রস্ত বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবে এটি এক ধরনের পরিণত জনমত। কারণ মানুষ একদিকে আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব কমে যাক তা চায় না, অন্যদিকে তারা বুঝে গেছে, প্রতিটি সংকটের সামরিক সমাধান নেই। ফলে জনমতের গভীরে তৈরি হয়েছে এক নতুন সমীকরণ: নেতৃত্ব হোক, তবে তা হোক সংযত; প্রভাব থাকুক, তবে তা হোক হিসাবি।
সাধারণ মানুষের জীবনে পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব এখন বেশি দৃশ্যমান
অনেক সময় পররাষ্ট্রনীতিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় বলে মনে হয়। কিন্তু আলোচনায় অংশ নেওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। বন্দরনির্ভর শ্রমিক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ী, রপ্তানিমুখী কৃষক—তাদের সবার জীবনেই বৈদেশিক নীতি সরাসরি প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনে নেওয়া সিদ্ধান্ত এখন শুধু কূটনীতিকদের টেবিলে আটকে থাকে না; তা পৌঁছে যায় বাজারদর, চাকরি, সরবরাহব্যবস্থা এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভেতরেও।
এই কারণেই অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার বাস্তব সুফল আরও স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা দরকার। শুধু “আমেরিকা নেতৃত্ব দেবে”—এ ধরনের বিমূর্ত ভাষা আর আগের মতো কাজ করে না। মানুষ জানতে চায়, এতে তার কী লাভ? তার চাকরি কি নিরাপদ হবে? পণ্যের দাম কি কমবে? জাতীয় নিরাপত্তা কি জোরদার হবে? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর ছাড়া বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন ধরে রাখা কঠিন।
নীতিভিত্তিক কূটনীতি চাই, কিন্তু নৈতিক উচ্চাসন নয়
মার্কিন জনমতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অনেকেই এখনও বিশ্বাস করেন, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মতো মূল্যবোধ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির ধারণা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়নি। বরং একটি বড় অংশ মনে করে, শক্তি থাকলে তার সঙ্গে নীতি থাকা উচিত।
কিন্তু এখানেও রয়েছে সতর্কতা। আলোচনায় অংশ নেওয়া অনেকে, বিশেষ করে তরুণরা, ‘আমেরিকান ব্যতিক্রমবাদ’ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের আপত্তি মূলত সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এমন এক নৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে, যে অন্য দেশকে শিক্ষা দিতে পারে বা নিজের মূল্যবোধ চাপিয়ে দিতে পারে। তাদের মতে, অতীতের সামরিক হস্তক্ষেপ, গাজায় ইসরায়েলকে সমর্থন, এবং নিজ দেশের গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ—এসব প্রেক্ষাপটে অন্যদের উপদেশ দেওয়ার ভঙ্গি অনেকের কাছেই কপট বা অহংকারী মনে হতে পারে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আসলে আধুনিক মার্কিন জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। আগে “গণতন্ত্র রপ্তানি” ধারণাটি বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল। এখন অনেকে বলছেন, আগে ঘর সামলাও, তারপর বিশ্বকে উপদেশ দাও। অর্থাৎ নীতিনিষ্ঠ কূটনীতি তারা চায়, কিন্তু সেই কূটনীতি যেন বিনয়ী হয়; নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে।
বাণিজ্য নিয়ে সমর্থন আছে, কিন্তু অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভও আছে
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে মার্কিন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেই দেখছেন অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে সুরক্ষাবাদী বক্তব্য জোরালো হয়েছে। তবুও জনমতের বড় অংশ বুঝে যে, বৈশ্বিক বাণিজ্য থেকে পুরোপুরি সরে আসা সম্ভবও নয়, লাভজনকও নয়।
তবে সমর্থনের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। শুল্ক বৃদ্ধির ফলে পণ্যের দাম বাড়ে—এ কথা মানুষ সরাসরি অনুভব করে। এর পাশাপাশি তারা মনে করে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের লাভ সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায় না। বিশেষ করে শিল্পনির্ভর অঞ্চলে চাকরি, মজুরি ও উৎপাদন নিয়ে বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে বাণিজ্যের প্রশ্নে জনমত একেবারে মুক্তবাজারপন্থীও নয়, আবার পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতাবাদীও নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তারও সমালোচনা উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারীরা এমন একটি বাণিজ্য কাঠামোর কথা বলেছেন, যা হবে পূর্বানুমানযোগ্য, স্থিতিশীল এবং ব্যবসা ও শ্রমবাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি করবে। এ থেকে বোঝা যায়, তারা শুধু “কঠোর” নীতি চায় না; তারা “স্থিতিশীল” নীতিও চায়। অর্থাৎ জনমত কখনও কখনও স্লোগানের চেয়ে বেশি বাস্তববাদী।
জলবায়ু প্রশ্নেও বদলে যাচ্ছে ভাষা
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভাজন আছে। কিন্তু আলোচনায় একটি আকর্ষণীয় প্রবণতা দেখা গেছে: অনেকেই এ ইস্যুকে শুধুমাত্র পরিবেশগত নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখছেন। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে এগিয়ে থাকা মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, শিল্প এবং ভবিষ্যৎ বাজারে এগিয়ে থাকা।
এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখায় যে, জলবায়ু ইস্যুকে মার্কিন ভোটারদের কাছে নতুন ভাষায় ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। “পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে” কথাটি যতটা কাজ করে, “অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গড়তে হবে” কথাটি অনেকের কাছে ততটাই বা তার চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। ফলে বৈশ্বিক সহযোগিতা নিয়েও জনমত অনেক সময় নৈতিক ভাষার বদলে অর্থনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছে।
শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির শিকড় দেশের ভেতরেই
সিএফআরের আলোচনায় আরেকটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে: সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে, দেশের ভেতরকার দুর্বলতা থাকলে বাইরের পৃথিবীতে স্থায়ী নেতৃত্ব দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক মেরুকরণ, গণতান্ত্রিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে অংশগ্রহণকারীরা বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখেছেন।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে পররাষ্ট্রনীতি আর অভ্যন্তরীণ নীতির মধ্যে কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে যাচ্ছে। মানুষ মনে করছে, যদি শিক্ষা খাত দুর্বল হয়, যদি আয়বৈষম্য বাড়তে থাকে, যদি জাতীয় ঐক্য ক্ষয়ে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নেওয়াও কঠিন হবে। এই ধারণা নতুন নয়, কিন্তু এখন তা আরও বাস্তবভাবে অনুভূত হচ্ছে।
অর্থনৈতিকভাবে মানুষ স্বস্তিতে থাকলে তারা বৈশ্বিক সম্পৃক্ততাকে বেশি সমর্থন করে—আলোচনায় এমন ধারণাও সামনে এসেছে। এর মানে দাঁড়ায়, পররাষ্ট্রনীতির টেকসই জনসমর্থন পেতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক সাফল্য দেখালেই হবে না; দেশের ভেতরে সেই সাফল্যের অনুবাদও ঘটাতে হবে।
জরিপের সংখ্যাগুলো কী বলছে
আলোচনা থেকে পাওয়া ধারণাগুলো জরিপের ফলাফলের সঙ্গেও মিল খায়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শিকাগো কাউন্সিলের এক জরিপে প্রতি ১০ জনের ৬ জন আমেরিকান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত। অর্থাৎ সক্রিয় আন্তর্জাতিক উপস্থিতির প্রতি এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন আছে।
এনপিআর/ইপসোসের জরিপে ১০ জনের মধ্যে ৬ জন উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের নৈতিক নেতা হিসেবে দেখতে চান। তবে বাস্তবতার প্রশ্নে আশাবাদ কম—১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন মনে করেন, দেশটি বর্তমানে সেই অবস্থানে রয়েছে। এই ব্যবধানটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বোঝায়, মানুষ এখনও একটি আদর্শ আমেরিকার ধারণা ধরে রেখেছে, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতাকে সেই মানদণ্ডে যথেষ্ট মনে করছে না।
একই বছরের সেপ্টেম্বরে রকফেলার ফাউন্ডেশনের জরিপে ৬১ শতাংশ মানুষ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে মত দেন। আবার মিত্রতার প্রশ্নে শিকাগো কাউন্সিলের জরিপে ১০ জনের ৯ জন অংশগ্রহণকারী বলেছেন, জোট গঠন পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর। এটি দেখায়, “আমেরিকা একাই সব করবে”—এমন ধারণা জনমনে ততটা শক্তিশালী নয়, যতটা রাজনৈতিক বক্তব্যে কখনও কখনও মনে হয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পক্ষেও উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। তবে একইসঙ্গে অনেকেই দেশীয় কর্মসংস্থান রক্ষায় আমদানি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছেন। অর্থাৎ মার্কিন জনমত এখানে ভারসাম্য খুঁজছে: একদিকে বিশ্ববাণিজ্যের সুবিধা, অন্যদিকে নিজ দেশের শ্রমবাজারের সুরক্ষা।
সমর্থন আছে, কিন্তু তা নিঃশর্ত নয়
এখানেই ট্রাম্প-যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পাঠটি পাওয়া যায়। আমেরিকানরা এখনও বৈশ্বিক নেতৃত্বের ধারণা পুরোপুরি বাতিল করেনি। কিন্তু তারা এই নেতৃত্বকে নিঃশর্ত চেক হিসেবে দিতেও প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পূর্তির সময়কার জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বর্তমান নীতির আক্রমণাত্মক চরিত্র নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে।
এপি-নর্ক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন, যা কয়েক মাস আগেও ছিল ৩৩ শতাংশ। এই পরিবর্তনকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এটি ইঙ্গিত দেয় যে, নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন থাকলেও অতিরিক্ত সংঘাতমুখী, চাপসর্বস্ব বা যুদ্ধঝুঁকিপূর্ণ নীতি খুব দ্রুত জনমতের ভেতরে প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে।
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের বিরুদ্ধেও জনমতের অনীহা একই বার্তা দেয়। অর্থাৎ আমেরিকানরা শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতিকে কিছুটা সমর্থন করতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের বাস্তব মূল্য দিতে তারা আগের চেয়ে অনেক কম আগ্রহী।
তাহলে কি মার্কিনিরা ট্রাম্পের মতো নেতাই চান?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল “হ্যাঁ” বা “না” দিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ সাধারণ মানুষ যে বৈশ্বিক সক্রিয়তা চায়, তা ট্রাম্পের সবধরনের কৌশলকে সমর্থন করে—এমন নয়। আবার তারা যে সংযত নেতৃত্ব চায়, তা দুর্বলতা বা নিষ্ক্রিয়তাও নয়। বরং জনমত বলছে, মার্কিনিরা এমন এক নেতৃত্ব চায় যা শক্তিশালী, কিন্তু বেপরোয়া নয়; জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক, কিন্তু অন্ধ একতরফা নয়; মূল্যবোধসম্পন্ন, কিন্তু আত্মম্ভরী নয়।
ট্রাম্পধাঁচের নেতৃত্বের কিছু দিক—যেমন “জাতীয় স্বার্থ আগে”, “অন্যদের ওপর খরচ কমাও”, “বাড়ির মানুষের লাভ নিশ্চিত করো”—এসব হয়তো ভোটারের একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু একই ভোটার যখন বলে জোট দরকার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার, বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা দরকার, যুদ্ধ এড়াতে হবে—তখন বোঝা যায়, তারা কেবল কঠোর ভাষার নেতা চান না; তারা ফলদায়ক নেতা চান।
জনমত সবসময় সরাসরি পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে না। অনেক সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বই জনমতকে প্রভাবিত করে, নতুন ভাষা দেয়, নতুন ভয় তৈরি করে, নতুন অগ্রাধিকার স্থির করে। তবুও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না: যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ভূমিকা ঠিক করতে সাধারণ আমেরিকানের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ, এবং তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জটিল।
সব মিলিয়ে ছবিটা এমন—মার্কিনিরা বিশ্বে নেতৃত্বের বিপক্ষে নয়। তারা চায় আমেরিকা সক্রিয় থাকুক, মিত্রতা গড়ুক, অর্থনীতি রক্ষা করুক, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মোকাবিলা করুক। তবে তারা একইসঙ্গে চায় এই নেতৃত্ব হোক সংযত, বাস্তবমুখী এবং দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। তাই প্রশ্নটি শুধু “ট্রাম্পের মতো নেতা কি তারা চান” নয়; বরং প্রশ্নটি হলো, তারা কেমন ধরনের আমেরিকা চান। আর সেই উত্তরে দেখা যাচ্ছে—তারা শক্তিশালী আমেরিকা চায়, কিন্তু বেপরোয়া আমেরিকা নয়।

