চলমান যুদ্ধ শুধু সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই—তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকায়। ইরান এখন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতই চাপে, আর লাখ লাখ মানুষ হারাচ্ছেন তাদের কাজ।
দেশটির শ্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিমন্ত্রী গোলাম হোসেইন মোহাম্মাদির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ইতোমধ্যেই চাকরি হারিয়েছেন। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—বরং এটি একটি বড় মানবিক সংকটের প্রতিফলন।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি-র এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিমান হামলায় অসংখ্য শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। একই সঙ্গে খুচরা ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি, এমনকি ডিজিটাল খাতেও মন্দা দেখা দিয়েছে। মানুষের আয় কমে যাওয়ায় পর্যটন ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার মতো সেবাখাতেও ধস নেমেছে।
যুদ্ধের সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এতে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। টানা ৫২ দিনের ইন্টারনেট বন্ধে প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের আয়ের একমাত্র পথই ছিল এসব প্ল্যাটফর্ম, যা এখন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী কর্মীরা। যুদ্ধের আগেই কর্মক্ষম নারীদের খুব অল্প অংশ কর্মসংস্থানে যুক্ত ছিলেন। তাদের অনেকেই ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসা করতেন। যুদ্ধের প্রভাবে সেই সুযোগও প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নারীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
যুদ্ধের সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প স্থাপনায় হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। বড় পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট এবং ইস্পাত কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতেও প্রভাব পড়ে লাখো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক কারখানাই উৎপাদন কমিয়ে বা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। প্রতি কর্মীর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ দেওয়ার কথা বলা হলেও, এর সুদের হার ও পরিশোধের সময়সীমা নিয়ে ইতোমধ্যেই সমালোচনা শুরু হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ইরানের অর্থনীতি এখন বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা—দুটোর সম্মিলিত প্রভাবে সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এই সংকট শুধু অর্থনীতিতে নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০ লাখ মানুষের চাকরি হারানো একটি সতর্ক সংকেত—যা দেখাচ্ছে, যুদ্ধের আসল মূল্য সবচেয়ে বেশি দিচ্ছে সাধারণ মানুষই।

