ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেটি শুধু একটি কূটনৈতিক মতভেদের প্রশ্ন নয়; এটি এখন ইউরোপের নৈতিক অবস্থান, মানবাধিকার নিয়ে তার ঘোষিত প্রতিশ্রুতি, এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতির ভেতরকার দ্বন্দ্ব—সবকিছুর এক জটিল মিলনবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে।
লুক্সেমবার্গে মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যখন বৈঠকে বসেন, তখন বিষয়টি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর: ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক কি নতুন করে বিচার করা উচিত? স্পেন, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো চাইছিল গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা হোক। কিন্তু জার্মানি ও ইতালি সেই পথে এগোতে রাজি হয়নি। ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল—একটি বড় বাণিজ্যিক চুক্তি স্থগিত করা—তা আপাতত আটকে যায়।
তবে এই আটকে যাওয়াই পুরো গল্প নয়। বরং এখানেই আসল প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে: ইউরোপ কি সত্যিই ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে প্রস্তুত, নাকি মানবাধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠ বক্তব্যের পরও শেষ পর্যন্ত পুরোনো বাস্তববাদী রাজনীতিতেই ফিরবে?
বিতর্কের কেন্দ্রে যে চুক্তি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইসরায়েল চুক্তিটি ২০০০ সালে কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে ইসরায়েল ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বিশেষ সুবিধা পায়, আর দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য, গবেষণা, কূটনীতি ও নানা খাতে সহযোগিতা শক্তিশালী হয়। যেহেতু ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, তাই এই চুক্তি কেবল প্রতীকী নয়—এটি বাস্তব প্রভাবসম্পন্ন এক কৌশলগত কাঠামো।
কিন্তু এই চুক্তিকে ঘিরে আজকের বিতর্ক মূলত অর্থনীতির কারণে নয়; বিতর্কের কেন্দ্রে আছে এর মানবাধিকার-সম্পর্কিত শর্ত। চুক্তির ধারা ২-এ বলা হয়েছে, দুই পক্ষের সম্পর্ক গড়ে উঠবে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি সম্মান বজায় রাখার ভিত্তিতে। অনেক সমালোচকের মতে, যদি এক পক্ষের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে এই ধারাই চুক্তি আংশিক বা পুরোপুরি স্থগিতের যুক্তি তৈরি করে।
অর্থাৎ, এই বিতর্কের আসল লড়াই হচ্ছে আইনি ভাষা আর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির মাঝখানে। প্রশ্ন হলো—ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি নিজের ঘোষিত মূল্যবোধকে বাস্তবে প্রয়োগ করবে?
কেন এখন চাপ বাড়ছে
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের ভেতরে ইসরায়েল নিয়ে অস্বস্তি যে মাত্রায় বেড়েছে, তা আগের বহু বছরের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। বিশেষ করে গাজা এবং দখলকৃত পশ্চিম তীরের ঘটনাপ্রবাহ এ চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়া এখন তুলনামূলকভাবে বেশি সরব। তাদের অবস্থান স্পষ্ট: যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং ন্যায়বিচারের কথা বলে, তাহলে সেই অবস্থান শুধু বিবৃতিতে আটকে থাকতে পারে না। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস লুক্সেমবার্গে সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আশা করেন প্রতিটি ইউরোপীয় দেশ আন্তর্জাতিক বিচার আদালত, জাতিসংঘ মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার বিষয়ে যে অবস্থান নিয়েছে, তা অক্ষুণ্ন রাখবে। তাঁর ভাষায়, এর ব্যত্যয় ঘটলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য পরাজয় হবে।
আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেলেন ম্যাকএন্টিও একই সুরে বলেন, পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, কারণ মৌলিক মূল্যবোধকে রক্ষা করতে হবে।
এখানে বোঝা যায়, বিষয়টি আর কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের নয়; এটি এখন ইউরোপের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নেও রূপ নিচ্ছে।
কিন্তু ইউরোপ একক কণ্ঠে কথা বলছে না
যারা মনে করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন খুব দ্রুত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাবে, তারা হয়তো বাস্তবতার একটি বড় দিক উপেক্ষা করছেন। কারণ ব্লকের ভেতর বিভাজন এখনো গভীর।
জার্মানি, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে স্পষ্টতই অনিচ্ছুক। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল স্পেনের প্রস্তাবকে “অনুপযুক্ত” বলে মন্তব্য করেন এবং জানান, যেকোনো বিরোধপূর্ণ বিষয়ও ইসরায়েলের সঙ্গে “সমালোচনামূলক ও গঠনমূলক” সংলাপের মাধ্যমেই আলোচনা করা উচিত।
এই অবস্থান ইউরোপীয় রাজনীতির একটি পুরোনো বাস্তবতাকে সামনে আনে: সব সদস্য রাষ্ট্র একই ইতিহাস, একই নিরাপত্তা-চিন্তা, একই নৈতিক অগ্রাধিকার বা একই কূটনৈতিক ভাষা নিয়ে হাঁটে না। ফলে গাজা নিয়ে ক্ষোভ বাড়লেও তা একক নীতিতে রূপ নেওয়া কঠিন।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভোও বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, আংশিক স্থগিতের প্রশ্ন উঠতে পারে বটে, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দেশের অবস্থানের কারণে পূর্ণ স্থগিতাদেশ এখনো নাগালের বাইরে।
অর্থাৎ, ইউরোপের ভেতরে দুই ধরনের প্রবণতা কাজ করছে। একদিকে আছে নীতিগত চাপ, অন্যদিকে আছে ভূরাজনৈতিক হিসাব। আর এই দুইয়ের সংঘাতে এখনো সিদ্ধান্তের বদলে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘায়িত টানাপোড়েন।
মানবাধিকার সংগঠন ও জনমতের চাপ
সরকারি পর্যায়ের ভেতরকার দ্বিধা যতই থাকুক, ইউরোপীয় সমাজের ভেতরে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। আজ বৃহস্পতিবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ৬০টির বেশি মানবাধিকার সংগঠন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েনের কাছে একটি বিবৃতি পাঠায়। সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সদস্য দেশগুলোকে দেরিতে হলেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তাদের দাবির মধ্যে ছিল—ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি স্থগিত করা, অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা, এবং ইসরায়েলের কাছে সব ধরনের অস্ত্র স্থানান্তর ও পরিবহন বন্ধ করা।
এই আহ্বান শুধু সংগঠনভিত্তিক নয়, নাগরিক পর্যায়েও চাপ তৈরি হয়েছে। ‘জাস্টিস ফর প্যালেস্টাইন’ নামে ইউরোপীয় নাগরিকদের একটি উদ্যোগ তিন মাসের মধ্যেই গত ১৫ এপ্রিল ১০ লাখ সই সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে চুক্তি স্থগিতের দাবি জানায়। এই প্রচারণায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানো, অবৈধ দখলদারত্ব বজায় রাখা এবং দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন অনুযায়ী, এত বড় জনসমর্থন পেলে ইউরোপীয় কমিশনকে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয় এবং কী পদক্ষেপ নেবে, তার যুক্তিও তুলে ধরতে হয়। কাজেই বিষয়টি আর কেবল নৈতিক আপত্তির পর্যায়ে নেই; এটি এখন প্রাতিষ্ঠানিক চাপের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
গাজা কেন এই বিতর্ককে এত তীব্র করেছে
চুক্তি স্থগিতের দাবির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ নিঃসন্দেহে গাজা। কারণ এখানে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা ইউরোপীয় সমাজে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর উপকূলীয় এই অঞ্চলে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আরও বহু মানুষ নিখোঁজ, যাদের একটি বড় অংশ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ইউরোপের জন্য এক রাজনৈতিক অস্বস্তির উৎস। কারণ একদিকে ইউরোপ আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও বেসামরিক সুরক্ষার কথা বলে; অন্যদিকে এমন বিপুল মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে তার কার্যকর নীতি কোথায়—সে প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে।
গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে “যুদ্ধবিরতি” চুক্তি হলেও, ইসরায়েলি বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সময়ের পর থেকে ৭০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলে জরুরি ত্রাণ প্রবেশেও কঠোর বাধা অব্যাহত রয়েছে।
এখানেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিধা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। যদি যুদ্ধবিরতির পরও প্রাণহানি ও অবরোধ অব্যাহত থাকে, তাহলে কূটনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো রেখে দেওয়ার নৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী থাকে?
আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর পদক্ষেপ কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই বিতর্কে আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপের বহু দেশ নিজেদের নীতিগত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়াকে উল্লেখ করে থাকে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেখানে গাজায় তাদের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যার শামিল বলে অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি এখনো চলমান।
এরপর গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের এক তদন্তে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে গণহত্যার উদ্দেশ্যের প্রশ্ন সামনে আসে—যা এই ইস্যুকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
আর ২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালত জানায়, তাদের এই বিশ্বাস করার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রয়েছে যে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্ট ইচ্ছাকৃতভাবে এবং জেনে-বুঝে গাজার বেসামরিক জনগণকে খাদ্য, পানি, ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মতো টিকে থাকার অপরিহার্য উপকরণ থেকে বঞ্চিত করেছেন।
একই প্রেক্ষাপটে আদালত ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি ও গ্রামগুলোতে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে “মানবতাবিরোধী অপরাধের” অভিযোগে হামাসের সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ওই হামলায় এক হাজারের বেশি ইসরায়েলি নিহত হয় এবং ২০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় দেইফ নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়।
এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায়—পুরো সংঘাতকে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় বিচার করা হচ্ছে বহুস্তরে, এবং অভিযোগের তীর একাধিক পক্ষের দিকেই গেছে। ফলে ইউরোপের জন্য নীতি নির্ধারণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
পশ্চিম তীর: নীরব বিস্ফোরণের আরেক কেন্দ্র
গাজা আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে থাকলেও, দখলকৃত পশ্চিম তীর নিয়েও উদ্বেগ কম নয়—বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে, এখানকার পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে সমানভাবে বিস্ফোরক।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ইউরোপীয় সরকারগুলোর ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়েছে। ফিলিস্তিনি ও অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করছেন, এই সহিংসতাকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়, এমনকি কখনো কখনো ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তা সমর্থন করে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে “চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের” বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আলোচনা জোরদার হয়েছে।
সমস্যা শুধু সহিংসতা নয়; অবৈধ বসতি নির্মাণও বড় ইস্যু। সমালোচকদের মতে, একবার ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা হলে সেই এলাকায় অবৈধ ইসরায়েলি বসতি গড়ে তোলা হয়, আর পরে কোনো এক সময় এসব বসতি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন পেয়ে যায়।
এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকেই দুর্বল করছে—এমন ধারণা এখন ইউরোপের অনেক দেশের মধ্যে দৃঢ় হয়েছে। কারণ বাস্তবে জমির ওপর নতুন নতুন বসতি তৈরি হতে থাকলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানের ভৌগোলিক ভিত্তিটাই ক্ষয়ে যায়।
গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক ও ফ্রান্সসহ ১৪টি দেশ দখলকৃত পশ্চিম তীরে ১৯টি বসতি অনুমোদনের জন্য ইসরায়েলকে নিন্দা জানায়। তারা বলেছিল, এই পদক্ষেপ অবৈধ এবং এটি গাজা যুদ্ধবিরতি ও অঞ্চলজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
একই মাসে জাতিসংঘ জানায়, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতির সম্প্রসারণ অন্তত ২০১৭ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো—আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ইসরায়েলের মতো দখলদার শক্তি নিজেদের বেসামরিক জনগণকে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্থানান্তর করতে পারে না। অথচ পশ্চিম তীরে বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ বসতি স্থাপনকারী বাস করছে।
তাহলে ইউরোপ কি সম্পর্ক ছিন্ন করবে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই: ইউরোপ কি সত্যিই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে?
এই মুহূর্তের বাস্তবতা বলছে, সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে এই বিষয়ে ঐকমত্য নেই। জার্মানি ও ইতালির মতো প্রভাবশালী দেশগুলো কঠোর পদক্ষেপের পথে নেই। হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্রও অনিচ্ছুক। ফলে পূর্ণ স্থগিতাদেশ বা সম্পর্ক ছিন্নের মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ নয়।
তবে এটাও সমান সত্য যে, আগের মতো সবকিছু চালিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক স্বস্তিও এখন আর নেই। বিতর্কটি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অন্তত নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতেই হবে। কারণ তার সামনে এখন তিন ধরনের চাপ একসঙ্গে কাজ করছে—
প্রথমত, আইনি চাপ—আন্তর্জাতিক বিচার আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং মানবাধিকার-ভিত্তিক চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক চাপ—সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একাংশের অবস্থান, বিশেষ করে স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়ার উদ্যোগ।
তৃতীয়ত, জনমতের চাপ—মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক উদ্যোগ এবং ইউরোপীয় সমাজের ভেতরে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ।
তাই খুব সম্ভবত সামনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের পথে না গিয়ে ধাপে ধাপে কিছু সীমিত ব্যবস্থা, প্রতীকী চাপ, আংশিক পুনর্মূল্যায়ন, অথবা বসতি-সম্পর্কিত আলাদা নিষেধাজ্ঞার মতো পথ বিবেচনা করতে পারে। অর্থাৎ সম্পর্ক হয়তো আজই ভাঙবে না, কিন্তু আগের মতো অনালোচিতও থাকবে না।
আসল সংকট কোথায়
এই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে শুধু ইসরায়েল নয়, ইউরোপও আছে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিক কূটনীতির পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু যখন বাস্তব পরিস্থিতি সেই ঘোষিত অবস্থানকে পরীক্ষা করে, তখনই প্রকাশ পায় ভেতরের ফাটল।
একদিকে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, কূটনীতি ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক; অন্যদিকে মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং গণমতের চাপ। এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইউরোপ এখন এমন এক সিদ্ধান্তহীনতার মুখোমুখি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
কারণ প্রশ্নটি আর কেবল এই নয় যে, একটি চুক্তি থাকবে কি থাকবে না। প্রশ্নটি হলো—ইউরোপ তার ঘোষিত মূল্যবোধকে কাগজে রাখবে, নাকি বাস্তব নীতিতেও রূপ দেবে।
এই মুহূর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইসরায়েল সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে—এমন বলা যাবে না। কিন্তু সম্পর্কের ভেতরে গভীর অস্বস্তি, নৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক বিভাজন যে দ্রুত বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
চুক্তি এখনো টিকে আছে। কিন্তু তার বৈধতা, নৈতিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছুই নতুন করে প্রশ্নের মুখে। গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে, ইউরোপের ওপর ততই বাড়বে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ।
আজকের প্রশ্ন “সম্পর্ক ছিন্ন হবে কি হবে না” নয়; বরং আরও গভীর প্রশ্ন হলো—ইউরোপ আর কতদিন তার মূল্যবোধ ও বাস্তব রাজনীতির এই দ্বৈত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে?

