বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা তীব্র গরম ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে গুরুতর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। এতে একশ’ কোটির বেশি মানুষের জীবিকা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
সাম্প্রতিক এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের তুলনায় তাপপ্রবাহ এখন বেশি ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে এবং এর স্থায়িত্বও দীর্ঘ হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু, মৎস্যসম্পদ ও বনাঞ্চলের ওপর। অতিরিক্ত গরমের কারণে কৃষিকাজের সময়সূচি ও পদ্ধতিও বদলে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মাঠে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সাল ছিল রেকর্ডের মধ্যে অন্যতম উষ্ণ বছর। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খরা, দাবানল এবং পোকামাকড়ের আক্রমণও বাড়ছে, যা কৃষি উৎপাদনে বড় ধাক্কা দিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা অধিকাংশ প্রধান ফসলের জন্য ক্ষতিকর। এই সীমা অতিক্রম করলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। উত্তর আফ্রিকার একটি দেশে টানা কয়েক বছরের খরা ও অতিরিক্ত গরমের ফলে শস্য উৎপাদন ৪০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। জলপাই ও লেবুজাতীয় ফলের উৎপাদন প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
শুধু স্থলভাগ নয়, সমুদ্রও এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। ‘মেরিন হিটওয়েভ’ বা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের কারণে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে, যা মাছের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে বিশ্বের প্রায় সব সমুদ্রই অন্তত একবার এই তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা পেয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে প্রধান চারটি খাদ্যশস্য—ধান, গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের ফলন গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়। ফলে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট। মধ্য এশিয়ার একটি দেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যার ফলে শস্য উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে যায়। দক্ষিণ আমেরিকার একটি বড় দেশে দীর্ঘমেয়াদি খরা ও অতিরিক্ত গরমে সয়াবিন উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। আবার উত্তর আমেরিকায় তীব্র তাপপ্রবাহ ফলজাত ফসলের বড় ক্ষতি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের কাছে সময়মতো তথ্য পৌঁছে দেওয়া। এতে তারা আবহাওয়া অনুযায়ী ফসল নির্বাচন ও চাষের সময় পরিবর্তন করতে পারবেন।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সমাধানের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈশ্বিক সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। কারণ তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু খাদ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের কর্মক্ষমতাকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক অঞ্চলে বছরের বড় অংশেই কাজ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

