ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক এখন এক অস্বস্তিকর মোড়ে দাঁড়িয়ে। বাইরে থেকে দেখলে পশ্চিমা জোট এখনও ঐক্যবদ্ধ বলেই মনে হতে পারে, কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে—ভেতরে ভেতরে বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলার পর ইউরোপের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ ওয়াশিংটনের পাশে না দাঁড়ানোয় এই দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ফাঁস হওয়া মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইল এখন সেই অস্বস্তিকেই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। ইমেইলটিতে এমন কিছু প্রস্তাবের কথা উঠে এসেছে, যা বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে স্পেনকে ন্যাটো থেকে বের করে দেওয়ার মতো ধারণা সামনে আসায় পশ্চিমা সামরিক জোটের ভেতরেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের পর বদলে যায় সমীকরণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আশা করেছিল, ন্যাটো ও ইউরোপের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা অন্তত রাজনৈতিক বা সামরিক সহায়তার মাধ্যমে পাশে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালিসহ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহ দেখায়নি।
এই অবস্থানকে ভালোভাবে নেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—সংকটের সময় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহায়তা করেনি। এর পর থেকেই ওয়াশিংটনের ভেতরে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে চাপ তৈরির নানা আলোচনা শুরু হয় বলে পেন্টাগনের ফাঁস হওয়া ইমেইলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এখানেই বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক মতবিরোধে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইমেইলে এমন প্রস্তাবও উঠে এসেছে, যার মাধ্যমে ইরান অভিযানে সমর্থন না দেওয়া মিত্রদের “শাস্তি” দেওয়ার পথ খোঁজা হচ্ছিল বলে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। যদিও এটি কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নয়, তবু এমন চিন্তাভাবনাই পশ্চিমা জোটের ভেতরের টানাপোড়েনের গভীরতা বোঝায়।
স্পেনকে ন্যাটো থেকে বাদ দেওয়ার ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত?
পেন্টাগনের ইমেইলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—স্পেনকে ন্যাটো থেকে বের করে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে স্পেন প্রত্যাশিত সহযোগিতা করেনি। বিশেষ করে স্পেন তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
স্পেনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—রোটা নৌঘাঁটি ও মোরোন বিমান ঘাঁটি। মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকায় সামরিক তৎপরতার ক্ষেত্রে এসব ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইরান যুদ্ধের সময় স্পেনের ‘না’ বলা ওয়াশিংটনের কাছে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ন্যাটো থেকে কোনো সদস্যকে বের করে দেওয়া এত সহজ নয়। ন্যাটোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জোটের প্রতিষ্ঠাতা চুক্তিতে কোনো সদস্য দেশকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা বহিষ্কারের বিধান নেই। অর্থাৎ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা সম্ভব হলেও আইনগতভাবে স্পেনকে ন্যাটো থেকে সরিয়ে দেওয়ার সরাসরি কোনো পথ নেই।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও বিষয়টি নিয়ে সংযত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তাঁর অবস্থান পরিষ্কার—স্পেন কোনো ফাঁস হওয়া ইমেইলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না; তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও সরকারি নথির ভিত্তিতেই বিষয়টি বিচার করে। এই প্রতিক্রিয়া একদিকে কূটনৈতিক, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের প্রতি একটি পরোক্ষ বার্তাও—মিত্রতার সম্পর্ক গুজব বা অভ্যন্তরীণ আলোচনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
যুক্তরাজ্যও চাপের বাইরে নয়
স্পেনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের নামও পেন্টাগনের ওই ইমেইলে এসেছে। বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রশ্নে লন্ডনও ট্রাম্প প্রশাসনের পাশে দাঁড়ায়নি।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করেছেন, চাপ প্রয়োগ করে যুক্তরাজ্যকে যুদ্ধে জড়ানো যাবে না। তাঁর অগ্রাধিকার ব্রিটিশ জনগণের স্বার্থ। এটি শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং অভ্যন্তরীণ জনমত, যুদ্ধের অর্থনৈতিক বোঝা এবং মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়ানোর আশঙ্কার সঙ্গেও যুক্ত।
ইমেইলে আরও একটি সংবেদনশীল বিষয় উঠে এসেছে—দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের দাবি দীর্ঘদিনের; অন্যদিকে আর্জেন্টিনাও এ দ্বীপপুঞ্জের দাবি করে আসছে। ফলে এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান বদলানোর ইঙ্গিত দিলেই লন্ডনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও তিক্ত হতে পারে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অবশ্য দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বক্তব্য অনুযায়ী, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাজ্যের হাতেই রয়েছে। দ্বীপবাসীরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক অঞ্চল হিসেবে থাকতে চেয়েছে—এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। লন্ডনের বার্তা স্পষ্ট: ফকল্যান্ড প্রশ্নে তাদের অবস্থান বদলাবে না, এবং দ্বীপবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গও বাড়িয়েছে দূরত্ব
ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েন শুধু ইরান যুদ্ধ ঘিরে নয়। এর আগেও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্য ইউরোপে কড়া প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, এবং এর বাসিন্দাদের সঙ্গে ইউরোপের ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে।
ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড দখল করার কথা বলেন, তখন ইউরোপীয় দেশগুলো এটিকে শুধু একক মন্তব্য হিসেবে নেয়নি; বরং মিত্রতার ভাষা ও সম্মানের প্রশ্ন হিসেবেও দেখেছে। এখন ইরান যুদ্ধ, স্পেন-ন্যাটো বিতর্ক এবং ফকল্যান্ড ইস্যু মিলিয়ে সেই পুরনো অস্বস্তি আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
পাকিস্তান ঘিরে শান্তি আলোচনার নতুন সম্ভাবনা
এদিকে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও আবার সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। যুদ্ধ অবসানের নতুন আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি করতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন। গতকাল শুক্রবার রাতে ছোট একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে তাঁর ইসলামাবাদ সফর শুরু করার কথা ছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, এ সফরের লক্ষ্য হলো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করতে চায় তেহরান।
আরাঘচির সফর শুধু পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামাবাদ সফরের পর তাঁর রাশিয়ার মস্কো এবং ওমানের মাস্কাটে যাওয়ার কথা রয়েছে। এর অর্থ, ইরান একাধিক কূটনৈতিক দরজা খোলা রাখতে চাইছে। পাকিস্তান, রাশিয়া ও ওমান—তিন পক্ষই বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক সংকটে মধ্যস্থতা বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও ইসলামাবাদে
শুধু ইরান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তানে যাচ্ছেন বলে জানানো হয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কেরোলিন লিভিট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জেরাড কুশনার আজ শনিবার ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা করবেন।
ফক্স নিউজকে দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ সরাসরি আলোচনায় অংশ নেবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরাসরি আলোচনা শুরু হলে অন্তত যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিংবা সামরিক উত্তেজনা কমানোর মতো বিষয়গুলো সামনে আসতে পারে।
তবে এই আলোচনা কতটা সফল হবে, তা এখনই বলা কঠিন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাস দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক হামলা, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ এবং তেলের বাজারে অস্থিরতা—সব মিলিয়ে আলোচনার পরিবেশও জটিল। তবু পাকিস্তানের মাটিতে উভয় পক্ষের প্রতিনিধি উপস্থিত হওয়া নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সংকেত।
হরমুজ প্রণালি ও তেলের বাজারে চাপ
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে জ্বালানি তেলের বাজারে। হামলার পর ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকালে ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১০৭ দশমিক ৪৮ ডলার পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এটি ৭ এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। ওই দিনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। হরমুজ প্রণালি এখনও মূলত অবরুদ্ধ থাকায় এবং যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে তেল উৎপাদন অর্ধেকের বেশি কমে যাওয়ায় বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে। সরবরাহ কমে গেলে এবং পরিবহন ঝুঁকি বাড়লে দাম বাড়াই স্বাভাবিক। ফলে তেলের বাজার এখন শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, সরাসরি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রতিফলন।
ফরেক্স ডটকমের বাজার বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদার মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তেলের দামের ঝুঁকি আরও ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। পরিকল্পিত আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর তেলের দাম দৃঢ়ভাবে বাড়ছে বলেও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার
কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই সামরিক প্রস্তুতিও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইউএসএস জর্জ এইচডব্লিউ বুশ বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এর ফলে এ অঞ্চলে কর্মরত মার্কিন বড় যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা বেড়ে তিনটিতে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সামরিক কমান্ড এক্সে এক পোস্টে জানায়, রণতরীটি ২৩ এপ্রিল ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বাধীন এলাকায় ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছিল। পোস্টে যুদ্ধবিমানে ভরা ডেকসহ জাহাজটির ছবিও যুক্ত ছিল।
এই সামরিক উপস্থিতির তাৎপর্য বড়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে যাচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক শক্তিও প্রদর্শন করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি নতুন কিছু নয়। অনেক সময় আলোচনার আগে সামরিক সক্ষমতা দেখিয়ে চাপ তৈরি করা হয়। তবে ঝুঁকিও আছে—এমন উপস্থিতি ভুল বোঝাবুঝি বা অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়াতে পারে।
পশ্চিমা জোটের জন্য বড় প্রশ্ন
পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়; এটি পশ্চিমা জোটের ভেতরের দুর্বলতাকেও সামনে এনে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় মিত্ররা তার নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলুক। অন্যদিকে ইউরোপের অনেক দেশ এখন নিজেদের জনগণের মতামত, অর্থনৈতিক চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে স্বাধীন অবস্থান নিতে চাইছে।
ন্যাটো দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা সামরিক ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু স্পেনকে বাদ দেওয়ার মতো আলোচনা—even যদি তা শুধু অভ্যন্তরীণ ইমেইলের পর্যায়েও থাকে—এই জোটের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ন্যাটোর কাঠামো হয়তো সদস্য বহিষ্কারের সুযোগ দেয় না, কিন্তু মিত্রদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হলে জোটের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স বা ইতালির মতো দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে গেলে সেটি ওয়াশিংটনের কাছে অবিশ্বাসের সংকেত হতে পারে। কিন্তু ইউরোপের দৃষ্টিতে এটি হতে পারে সতর্ক বাস্তববাদ—আরেকটি দীর্ঘ যুদ্ধের দায় নিতে তারা প্রস্তুত নয়।
সামনে কী হতে পারে?
এখন নজর থাকবে তিনটি দিকে।
প্রথমত, পাকিস্তানে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা বাস্তব অগ্রগতি আনে কি না। যদি সরাসরি সংলাপ শুরু হয়, তবে অন্তত উত্তেজনা কমানোর একটি পথ খুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে তেলের দাম আরও চাপের মুখে পড়তে পারে, যার প্রভাব শুধু পশ্চিমা অর্থনীতি নয়, বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপরও পড়বে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক। পেন্টাগনের ইমেইল যদি শুধু একটি অভ্যন্তরীণ আলোচনা হয়, তবু তার রাজনৈতিক প্রতিধ্বনি থামবে না। কারণ এটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন মিত্রদের মধ্যে আস্থা এমনিতেই নড়বড়ে।
সব মিলিয়ে ইরান সংকট এখন একাধিক স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে—যুদ্ধক্ষেত্র, কূটনীতি, জ্বালানি বাজার এবং পশ্চিমা জোটের ভেতরের সম্পর্ক। পাকিস্তান ঘিরে নতুন আলোচনার উদ্যোগ আশার আলো দেখালেও বাস্তবতা হলো, সামরিক চাপ ও রাজনৈতিক অবিশ্বাস এখনো পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে রেখেছে।

