বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক জাতিসংঘ-সমর্থিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এই সংকট এখন আরও ঘনীভূত ও জটিল রূপ নিচ্ছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, চরমভাবাপন্ন জলবায়ু, জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধির মতো একাধিক কারণ একসঙ্গে মিলে বহু দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তিকে অনিশ্চিত করে তুলছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত বছর বিশ্বে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়া মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই বাস করেছে মাত্র ১০টি দেশে—যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
খাদ্য সংকট এখন শুধু দরিদ্র দেশগুলোর সমস্যা নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক বাজারব্যবস্থার চাপের সম্মিলিত ফল।
জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন মানবিক সহায়তা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে সংঘাত এবারও বড় ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি অনেক দেশের খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
কোন ১০ দেশে খাদ্য সংকট বেশি কেন্দ্রীভূত?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের বড় অংশ যে ১০টি দেশে কেন্দ্রীভূত, সেগুলো হলো—
আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, কঙ্গো, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন।
এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকা বিশেষভাবে ভাবনার বিষয়। কারণ বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বাজারদর, আমদানি ব্যয় এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—সব মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
তবে প্রতিবেদনে এটিও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও সিরিয়ার মতো কিছু দেশে পরিস্থিতির উন্নতি দেখা গেছে। কিন্তু একই সময়ে আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার ও জিম্বাবুয়েতে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। অর্থাৎ সংকটের ধরন সব দেশে এক নয়—কোথাও যুদ্ধ, কোথাও জলবায়ু, কোথাও অর্থনৈতিক চাপ, আবার কোথাও একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
সংঘাত কেন খাদ্য সংকটের প্রধান কারণ?
খাদ্য সংকটের পেছনে সংঘাতকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর কারণ খুব স্পষ্ট। যখন কোনো দেশে যুদ্ধ বা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে, তখন কৃষক জমিতে যেতে পারেন না, ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাজার বন্ধ হয়ে যায়, খাদ্য পরিবহন ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
বাস্তুচ্যুত মানুষ সাধারণত নিজের জমি, কাজ, আয় ও খাদ্যের উৎস হারিয়ে ফেলে। ফলে তারা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমে যায়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
সুদান, দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, মিয়ানমার বা আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, সংঘাত শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নষ্ট করে না; এটি খাদ্যব্যবস্থার মূল কাঠামোকেও ভেঙে দেয়। কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারে খাদ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন সংকটকে আরও গভীর করছে
প্রতিবেদনে সংঘাতের পাশাপাশি চরমভাবাপন্ন আবহাওয়াকেও খাদ্য সংকটের বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ এবং অনিয়মিত মৌসুমি পরিবর্তন কৃষির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের মতো দেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ দেশের বড় অংশ কৃষিনির্ভর এবং বহু মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। জলবায়ুর ধাক্কা পড়লে শুধু ফসল নষ্ট হয় না; খাদ্যের দাম বাড়ে, কর্মসংস্থান কমে, দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বাড়ে।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা মানে শুধু বাজারে খাদ্য থাকা নয়; বরং সেই খাদ্য কেনার সামর্থ্য থাকা। বাজারে চাল, ডাল, তেল বা সবজি পাওয়া গেলেও যদি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা
প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে—আন্তর্জাতিক সাহায্য দ্রুত কমে যাচ্ছে। এটি খাদ্য সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। কারণ অনেক দেশে খাদ্য সহায়তা, পুষ্টি সহায়তা, কৃষি সহায়তা ও জরুরি মানবিক সহায়তা আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল।
সহায়তা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু, নারী, বয়স্ক মানুষ, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী এবং দরিদ্র কৃষক পরিবার। খাদ্য সহায়তা কমে গেলে অপুষ্টি বাড়ে, শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামাজিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও প্রভাব ফেলতে পারে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চলমান সংকটগুলোকে আরও গভীর করতে পারে। এর প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে এবং সার উৎপাদনের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
রোপণের মৌসুমে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। উৎপাদন খরচ বাড়লে ফসলের দামও বাড়তে পারে। আর খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের প্রধান আলভারো লারিও এএফপিকে বলেছেন, রোপণের মৌসুমে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি খাদ্য উৎপাদনের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তা বাড়ানো, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং জলবায়ু সহনশীল ফসলে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তা কেন জরুরি?
খাদ্য নিরাপত্তার আলোচনায় ক্ষুদ্র কৃষকদের বিষয়টি অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ বহু দেশে খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশই আসে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে। তাদের হাতে বড় পুঁজি থাকে না, আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগও সীমিত।
সারের দাম বাড়লে, সেচের খরচ বাড়লে বা আবহাওয়া অনিশ্চিত হলে প্রথম ধাক্কা লাগে এই কৃষকদের ওপর। তারা উৎপাদন কমিয়ে দেন, ঋণে পড়েন বা কৃষি থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। এর প্রভাব পড়ে পুরো খাদ্যব্যবস্থায়।
প্রতিবেদনে স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন এবং মাটির গুণগত মান উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার কথাও এসেছে। এর অর্থ হলো, আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে দেশগুলোর নিজস্ব কৃষি সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। শুধু খাদ্য আমদানি করে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি কী?
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রতিবেদনকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা দরকার। দেশে খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য থাকলেও খাদ্য নিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। মানুষের আয়, বাজারদর, পুষ্টির মান, জলবায়ু ঝুঁকি, কৃষকের উৎপাদন খরচ এবং সামাজিক সুরক্ষা—সবকিছু মিলেই খাদ্য নিরাপত্তা তৈরি হয়।
বাংলাদেশে কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলা হলেও তালিকায় দেশের নাম থাকা দেখায়, ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি ব্যয় বৃদ্ধি এবং দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
সরকারি নীতি, কৃষি বিনিয়োগ, খাদ্য মজুতব্যবস্থা, বাজার তদারকি, ক্ষুদ্র কৃষকের সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—সবকিছুকে আরও সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা এখন শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, জলবায়ু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং সামাজিক নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বিশ্বের খাদ্য সংকট এখন বিচ্ছিন্ন কোনো মানবিক সমস্যা নয়। এটি সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক চাপ ও বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একটি গভীর সংকট। মাত্র ১০টি দেশে খাদ্য সংকটে পড়া মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ বাস করে—এই তথ্যই দেখায়, ঝুঁকি কতটা কেন্দ্রীভূত এবং কতটা গুরুতর।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিবেদন একই সঙ্গে সতর্কতা ও সুযোগের বার্তা দেয়। সতর্কতা হলো—জলবায়ু, বাজার ও কৃষি ব্যয়ের চাপকে অবহেলা করলে খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বল হতে পারে। আর সুযোগ হলো—ক্ষুদ্র কৃষক, স্থানীয় উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতের খাদ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

