ইসরায়েলের আগামী অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন ঘিরে দেশটির রাজনীতি নতুন মোড় নিতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরাতে এবার একসঙ্গে মাঠে নামছেন দেশটির দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদ। বিরোধী শিবিরে এতদিন যে বিভক্তি দেখা যাচ্ছিল, এই উদ্যোগ তা অনেকটাই কমাতে পারে। ফলে আসন্ন নির্বাচন শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াই নয়, বরং নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর এক বড় গণভোটে পরিণত হতে পারে।
রোববার ইয়াইর লাপিদ জানান, তিনি নাফতালি বেনেটের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন। তাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো। বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেনেটের দল ও লাপিদের দল যৌথভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে থাকবেন বেনেট। এই তথ্য বার্তা সংস্থা এপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই জোটের তাৎপর্য শুধু দুই নেতার হাত মেলানোতে সীমাবদ্ধ নয়। বেনেট ও লাপিদ ইসরায়েলি রাজনীতির দুই ভিন্ন ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। বেনেট ডানপন্থি অবস্থানের জন্য পরিচিত, আর লাপিদ তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি রাজনীতির মুখ। তবু নেতানিয়াহুবিরোধী অবস্থান তাদের এক জায়গায় এনেছে। এর আগেও ২০২১ সালে তারা একসঙ্গে জোট সরকার গঠন করেছিলেন। সেই সরকার অল্প সময়ের জন্য হলেও নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনধারায় বিরতি এনেছিল। এবার তারা আবার সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে এনে ভোটারদের কাছে নতুন আস্থার বার্তা দিতে চাইছেন।
লাপিদের বক্তব্যে বোঝা যায়, তারা এই জোটকে শুধু নির্বাচনী কৌশল হিসেবে দেখছেন না। তাদের দাবি, ইসরায়েলের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন দরকার। নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসন, যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক, দুর্নীতির মামলা এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিরোধীরা এখন তাকে দুর্বল অবস্থানে দেখছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে গাজায় হামলা শুরুর পর থেকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন আরও বেড়েছে।
তবে বেনেট ও লাপিদের অবস্থানও একেবারে সরল নয়। তারা হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিরোধিতা করেননি। তাদের আপত্তি মূলত যুদ্ধ পরিচালনার ধরন, কৌশলগত ফলাফল এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে। বিরোধীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু যুদ্ধকে এমনভাবে পরিচালনা করেছেন, যাতে ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং দেশের ভেতরেও আস্থাহীনতা বেড়েছে।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতির প্রশ্নেও নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বেড়েছে। ইসরায়েলি রাজনীতিতে নিরাপত্তা সব সময় বড় ইস্যু। কিন্তু বিরোধীরা এখন সেই নিরাপত্তা প্রশ্নকেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। তাদের যুক্তি, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও তিনি স্থায়ী নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক স্থিতি দিতে পারেননি। এ কারণেই অক্টোবরের নির্বাচন তার জন্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হতে পারে।
নাফতালি বেনেটকে এই জোটের সামনে রাখার পেছনেও রাজনৈতিক হিসাব আছে। তিনি একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অনেকেই তাকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শিষ্য বলতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক বদলে যায়। বেনেট এখন নেতানিয়াহুর অন্যতম কড়া সমালোচক। তার ডানপন্থি পরিচয় নেতানিয়াহুর ভোটঘাঁটিতে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে লাপিদের মধ্যপন্থি অবস্থান শহুরে ও উদার ভোটারদের আকর্ষণ করতে পারে। এই দুই ধারার মিলনই জোটটির সবচেয়ে বড় শক্তি।
বেনেটের ব্যক্তিগত জীবনের গল্পও ভোটের মাঠে কাজে লাগতে পারে। ৫৪ বছর বয়সী এই নেতা রাজনীতিতে আসার আগে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। ২০০৫ সালে তিনি তার প্রতিষ্ঠান ১৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতেও তার কমান্ডার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। ব্যবসা, সামরিক পটভূমি ও রাজনীতির মিশ্র অভিজ্ঞতা তাকে তরুণ ভোটারদের কাছে আলাদা করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে ইয়াইর লাপিদ ৬২ বছর বয়সী এক পরিচিত রাজনৈতিক মুখ। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি টেলিভিশন সাংবাদিক হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। ২০১২ সালে তিনি নিজের দল গঠন করেন এবং দ্রুত ইসরায়েলি রাজনীতিতে বড় শক্তি হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সময়কাল দীর্ঘ না হলেও বিরোধী নেতা হিসেবে তিনি ধারাবাহিকভাবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাই বেনেটের সঙ্গে তার জোট বিরোধী রাজনীতিকে আরও সংগঠিত করতে পারে।
নেতানিয়াহু অবশ্য এখনো ইসরায়েলি রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন। ৭৬ বছর বয়সী এই নেতা বিভিন্ন মেয়াদে ১৮ বছরেরও বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তার শক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে সেটিই এখন তার দুর্বলতাও হয়ে উঠছে। কারণ বিরোধীরা তাকে পুরোনো রাজনীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে। তারা বলতে চাইছে, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্লান্তি কাটাতে নেতৃত্ব বদল জরুরি।
তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও এখনো বড় রাজনৈতিক বোঝা। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ঘুষ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে বিচারাধীন আছেন; তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এই বিচারপ্রক্রিয়া ইসরায়েলি রাজনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নেতানিয়াহুর ওপর চাপ কম নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালতের নথিতে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উল্লেখ আছে। তবে “গণহত্যার অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা”—এভাবে বলা যথাযথ নয়; গণহত্যা-সংক্রান্ত আলাদা মামলা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলছে।
এই জায়গাতেই বেনেট-লাপিদ জোটের রাজনৈতিক বার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা নেতানিয়াহুকে শুধু একজন প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে নয়, বরং এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। তাদের প্রচারের কেন্দ্রীয় কথা হতে পারে—নিরাপত্তা চাই, কিন্তু রাজনৈতিক জবাবদিহিও চাই; শক্তিশালী রাষ্ট্র চাই, কিন্তু বিভক্ত সমাজ নয়।
তবে এই জোটের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বেনেট ও লাপিদের রাজনৈতিক আদর্শ এক নয়। ক্ষমতায় গেলে নীতি, জোটসঙ্গী, নিরাপত্তা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে মতভেদ দেখা দিতে পারে। ২০২১ সালের জোট সরকারও নানা মতপার্থক্যের কারণে টেকেনি। তাই ভোটারদের শুধু নেতানিয়াহুবিরোধী আবেগে ধরে রাখা যথেষ্ট হবে না। তাদের দেখাতে হবে, তারা স্থিতিশীল সরকার দিতে পারবেন।
অক্টোবরের নির্বাচন তাই তিনটি প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, ইসরায়েলি ভোটাররা কি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে প্রস্তুত? দ্বিতীয়ত, বেনেট ও লাপিদ কি নিজেদের ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়কে শক্তিতে পরিণত করতে পারবেন? তৃতীয়ত, যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ইসরায়েল কি নতুন নেতৃত্বের ঝুঁকি নিতে চাইবে?
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন এখন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহু এখনো শক্তিশালী, কিন্তু আগের মতো অপ্রতিরোধ্য নন। বেনেট ও লাপিদের জোট সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনছে। অক্টোবরের ভোটে তারা নেতানিয়াহুকে হারাতে পারবেন কি না, তা সময় বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইসরায়েলের রাজনীতিতে এবার লড়াই শুধু আসনসংখ্যার নয়; এটি নেতৃত্ব, আস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার লড়াই।
সিভি/এইচএম

