হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঘটনা আবারও বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে। আমরা সাধারণত পণ্যের দাম বাড়া, বাজারে সংকট তৈরি হওয়া, বা কোনো জরুরি জিনিসের ঘাটতি দেখা দিলে সমস্যাটি বুঝতে পারি। কিন্তু এর পেছনের আসল কারণ অনেক সময় চোখে পড়ে না। বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও বাণিজ্য এখন এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, একটি ছোট অংশ বন্ধ হয়ে গেলেও তার ধাক্কা বহু দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২০২০ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনীতি একের পর এক বড় সরবরাহ সংকটের মুখে পড়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতি ছিল প্রথম বড় সতর্কবার্তা। এরপর বিভিন্ন সময়ে খাদ্য, সার, জ্বালানি, অর্ধপরিবাহী এবং শিল্প কাঁচামালের সংকট দেখা গেছে। এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঘটনাও একই বাস্তবতা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সমস্যা শুধু একটি পথ বা একটি পণ্য নিয়ে নয়। সমস্যা হলো, সরকারগুলো এখনো জানে না তাদের অর্থনীতি কোন কোন গোপন নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
বর্তমান সংকটের পুরো প্রভাব এখনো দেখা যায়নি। এর ফল বুঝতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। যেমন, সালফারের সরবরাহ ব্যাহত হলে সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর সালফিউরিক অ্যাসিডের ঘাটতি চিলির তামা উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে সারের দাম বেড়ে গেলে বছরের শেষ দিকে খাদ্য সরবরাহ ও ভোক্তা মূল্য দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে। আমদানিনির্ভর দেশগুলো এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: আগামী বছরগুলোতে আর কোন কোন পণ্য বা খাতে এমন সংকট দেখা দিতে পারে? গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার পর সরকারগুলোর উচিত ছিল সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা আরও ভালোভাবে চিহ্নিত করা। কিন্তু বাস্তবে অগ্রগতি সীমিত। অনেক দেশ এখনো সংকট শুরু হওয়ার আগে ঝুঁকি বুঝতে পারে না। তারা সংকটের পর প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে একই ধরনের ধাক্কা বারবার ফিরে আসে।
কিছু অগ্রগতি অবশ্য হয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার মূল্য সংযোজনভিত্তিক বাণিজ্য তথ্যভান্ডার বিভিন্ন পণ্য, উপাদান ও সেবার প্রবাহ সম্পর্কে ধারণা দেয়। এটি বিশ্ব উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরের কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু এর সীমাবদ্ধতাও আছে। তথ্যগুলো সমষ্টিগত, এবং এগুলো ২০২২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্ববাজারের বাস্তব চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে বোঝার জন্য এই তথ্য যথেষ্ট নয়।
আরও কিছু উদ্যোগ আছে, যেগুলো পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য তুলনামূলকভাবে বিস্তারিতভাবে দেখায়। তবু অনেক বড় ঝুঁকি এখনো অস্পষ্ট। কিছু দুর্বলতা অবশ্য সবার জানা। যেমন, উন্নত অর্ধপরিবাহী উৎপাদনে তাইওয়ানের প্রভাব খুব বড়। একটি তাইওয়ানি প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক সরবরাহের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের অতিনির্ভরতা কোনো এক দেশের সমস্যা নয়; এটি পুরো বিশ্ব অর্থনীতির নিরাপত্তা প্রশ্ন।
সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি বোঝার জন্য শুধু বড় শিল্পের দিকে তাকালেই হবে না। অনেক সময় সস্তা, ছোট বা সাধারণ মনে হওয়া উপাদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি যন্ত্র, একটি যানবাহন, একটি চিকিৎসা সরঞ্জাম বা একটি কৃষিপণ্য তৈরিতে শত শত ছোট উপাদান লাগে। এর মধ্যে একটির সরবরাহ বন্ধ হলে পুরো উৎপাদন থেমে যেতে পারে। তখন একটি ক্ষুদ্র ঘাটতি বড় অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
সাইকেল শিল্পের উদাহরণটি এ ক্ষেত্রে খুব স্পষ্ট। অধিকাংশ সাইকেলের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান শিমানোর ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি চাহিদা সামলাতে হিমশিম খেয়েছে। একই ঘটনা গাড়ি শিল্পেও দেখা যায়। অনেক বিশেষায়িত যন্ত্রাংশের বাজারে এক বা দুই প্রতিষ্ঠান বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। শিল্পের ভেতরের মানুষ এসব নির্ভরতা জানেন। কিন্তু নীতিনির্ধারকেরা সব সময় সেসব সংকেত সময়মতো ধরতে পারেন না।
বিশ্ববাণিজ্যের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, উৎপাদিত পণ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মধ্যবর্তী উপাদান নিয়ে গঠিত। অর্থাৎ দেশগুলো শুধু শেষ পণ্য কেনাবেচা করে না; তারা যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল, অর্ধতৈরি পণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত উপাদানও বিপুল পরিমাণে বিনিময় করে। এই ব্যবস্থাই বিশ্বায়নকে দ্রুত এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতাও গভীর করেছে।
আদম স্মিথ প্রায় ২৫০ বছর আগে দেখিয়েছিলেন, বিশেষায়ন উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। মানুষ বা প্রতিষ্ঠান যখন কোনো নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ হয়, তখন উৎপাদন বাড়ে, খরচ কমে এবং বাজার বিস্তৃত হয়। আধুনিক বিশ্বায়ন এই ধারণাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, অতিরিক্ত বিশেষায়ন অনেক সময় বিকল্প সরবরাহকারী তৈরি হতে দেয় না। ফলে কোনো একটি উৎস বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।
এখানে বাজারের আকারও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিশেষ যন্ত্রাংশের চাহিদা যদি সীমিত হয়, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান সেই পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় না। ফলে এক বা দুই প্রতিষ্ঠানই পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। শান্ত সময়ে এটি দক্ষ ও লাভজনক মনে হয়। কিন্তু সংকটের সময় এই ব্যবস্থাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তখন দক্ষতা নয়, স্থিতিস্থাপকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
সব সংকটের প্রভাব সমান নয়। সাইকেল পেতে দেরি হওয়া বিরক্তিকর হতে পারে, কিন্তু খাদ্য, পানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম বা জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে ফল অনেক বেশি গুরুতর হয়। এসব ক্ষেত্রে সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা সরাসরি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তাই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এখন আর শুধু বাণিজ্য বা শিল্পনীতির বিষয় নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
কিছু দেশ ইতিমধ্যে কৌশলগত খাত চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতি মনোযোগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধপরিবাহী উৎপাদনে বিনিয়োগ তার একটি বড় উদাহরণ। কিন্তু শুধু নতুন প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আলোচিত খাতে মনোযোগ দিলেই হবে না। বিদ্যমান শিল্প, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং নিত্যব্যবহার্য উপাদানের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিনির্ধারকদের এখন সরবরাহ শৃঙ্খলকে নতুন চোখে দেখতে হবে। কোন পণ্যের জন্য দেশটি কাদের ওপর নির্ভরশীল, কোন উপাদানের বিকল্প নেই, কোন পথে পণ্য আসে, কোন বন্দর বা প্রণালি বন্ধ হলে বাজারে ধাক্কা লাগে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দরকার। শুধু সংকটের সময় জরুরি বৈঠক করলেই হবে না। আগেই ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সস্তা উৎপাদন সব সময় নিরাপদ উৎপাদন নয়। কম খরচের জন্য বহু দেশ উৎপাদনকে দূরবর্তী ও সীমিত উৎসের ওপর নির্ভরশীল করেছে। এতে দাম কমেছে, কিন্তু ঝুঁকি বেড়েছে। এখন সেই ঝুঁকির মূল্য দিতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও ধাক্কা আসবে—এটি অনুমান নয়, বাস্তব সম্ভাবনা। তাই প্রস্তুত দেশগুলো দ্রুত সামলে উঠবে, আর অপ্রস্তুত দেশগুলো বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহের বৈচিত্র্য এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। যে দেশগুলো নিজেদের দুর্বলতা বুঝবে, বিকল্প উৎস তৈরি করবে এবং জরুরি পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তারা ভবিষ্যতের সংকটে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকবে। আর যারা এই লুকানো ঝুঁকিগুলো উপেক্ষা করবে, তারা হয়তো পরবর্তী ধাক্কায় বুঝবে—বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ অনেক সময় চোখের সামনে থাকে না, থাকে সরবরাহ শৃঙ্খলের অদৃশ্য ফাঁকে।

