ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কূটনীতির পাশাপাশি সামরিক চাপও সামনে চলে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম ইরানের বিরুদ্ধে ‘স্বল্পমেয়াদি কিন্তু শক্তিশালী’ হামলার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একটি উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন সামরিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের পরিকল্পনা নয়; বরং সীমিত সময়ের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষতি করে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ট্রাম্প এই হামলার অনুমোদন দেননি। বরং তিনি ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার পথকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। জনসমক্ষে তিনি এই চাপ প্রয়োগের নীতিকে ‘বোমার চেয়েও কার্যকর’ বলে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ হলো, ওয়াশিংটন এখনই সরাসরি যুদ্ধের পথে হাঁটতে চায় না, তবে সামরিক বিকল্প হাতে রেখে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে চায়।
এক্সিওস ও বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, সেন্টকমের পরিকল্পনায় ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেল রপ্তানি স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, কমান্ড সেন্টার এবং ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক মিলিশিয়া নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামো।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণ নয়। বরং খুব অল্প সময়ের মধ্যে এমন আঘাত হানা, যাতে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় বড় চাপ তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, এ ধরনের চাপ তেহরানকে আরও নমনীয় অবস্থানে নিয়ে আসতে পারে এবং আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে।
তবে পরিকল্পনার আরেকটি দিক আরও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ও বিবেচনায় আছে। এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হলে স্থল অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে। আর স্থল অভিযান মানেই সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। জ্বালানি পরিবহন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে এই প্রণালির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই এ অঞ্চলে সামান্য সামরিক উত্তেজনাও বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আরব সাগরে হরমুজ প্রণালির কাছে ‘এমভি ব্লু স্টার ৩’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের তল্লাশির ঘটনা চলমান উত্তেজনার প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এই ধরনের নৌতৎপরতা শুধু সামরিক বার্তা নয়, বরং ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর একটি দৃশ্যমান কৌশলও।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনার মূল বাধা এখন পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি। ইরান হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়ে তিন স্তরের একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
এর পর থেকেই কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখনো নৌ-অবরোধের ওপর নির্ভর করছে, তবে কূটনীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হলে সামরিক আঘাতের পথ খোলা রাখছে। এই অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখছেন।
অর্থাৎ, হামলার পরিকল্পনা থাকা মানেই হামলা আসন্ন—এমন নয়। বরং এটি ইরানকে বোঝানোর চেষ্টা হতে পারে যে আলোচনায় না এলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আরও কঠোর বিকল্প রয়েছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর সামনে এসেছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, সেন্টকম পেন্টাগনের কাছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ‘ডার্ক ঈগল’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছে।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মোতায়েনযোগ্য হাইপারসনিক অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির পাঁচ গুণের বেশি গতিতে ১ হাজার ৭২৫ মাইলের বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম।
এই ধরনের অস্ত্র বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার জন্য। যেমন মাটির গভীরে থাকা বাংকার, শক্তিশালী সামরিক স্থাপনা বা ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা। ইরানের ভেতরের গভীর এলাকায় থাকা ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াতেই এই অস্ত্র মোতায়েনের কথা ভাবা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই ধরনের অস্ত্র মোতায়েন শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে ডার্ক ঈগল মোতায়েন করে, তাহলে ইরানের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো নৌ-অবরোধ, অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক দরকষাকষি চালিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টি হলো সীমিত সামরিক আঘাতের মাধ্যমে ইরানকে দ্রুত চাপের মুখে ফেলা।
ট্রাম্প এখনো প্রথম পথকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। কারণ সরাসরি হামলা হলে তা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। হরমুজ প্রণালি আরও অস্থির হলে তেলের বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা একসঙ্গে ঝুঁকিতে পড়বে।
অন্যদিকে, শুধু অবরোধ দিয়ে ইরানকে কতদূর পর্যন্ত চাপ দেওয়া সম্ভব, সেটিও বড় প্রশ্ন। দীর্ঘমেয়াদি চাপ ইরানকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তেহরানকে আরও কঠোর অবস্থানেও ঠেলে দিতে পারে।
ইরানের শক্তির একটি বড় অংশ শুধু তার নিজস্ব সেনাবাহিনী নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা ইরানপন্থী মিলিশিয়া নেটওয়ার্কও। এই নেটওয়ার্কগুলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সেন্টকমের পরিকল্পনায় এসব নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা থাকলে তা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে আঘাত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এর ঝুঁকিও কম নয়। কারণ এ ধরনের আঘাত ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর পাল্টা প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
ফলে সংঘাত শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ না থেকে ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন বা উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সেন্টকমের এমন পরিকল্পনা থাকা মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই হামলা চালাবে। বড় শক্তিগুলো সাধারণত নানা ধরনের সামরিক বিকল্প প্রস্তুত রাখে, যাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এখানে পরিকল্পনাটির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো চাপ সৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বোঝাতে চায়, আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেলে সামরিক পথও খোলা আছে। আবার একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের কাছেও দেখাতে চাইছে যে তারা ইরান ইস্যুতে দুর্বল অবস্থানে নেই।
তবে সামরিক পরিকল্পনা কখনোই পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। সীমিত হামলা শুরু হলেও তা সীমিত থাকবে—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইরান পাল্টা জবাব দিলে পরিস্থিতি দ্রুত বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি শক্তিশালী হামলার প্রস্তুতি—এই দুই কৌশল মিলিয়ে ওয়াশিংটন এখন তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই চাপ ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনবে, নাকি আরও বড় সংঘাতের দরজা খুলে দেবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া। কারণ হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি বাজার, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে এই সংকট শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিষয় নয়; এর প্রভাব পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে।
সিভি/এইচএম

