মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনাও। বহু বছর ধরে যেই হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তেল, গ্যাস ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের বড় অংশ পরিচালিত হয়েছে, সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখন আরব দেশগুলো বুঝতে পারছে—একটি মাত্র সমুদ্রপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় দুই মাস ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। এই প্রণালি শুধু একটি জলপথ নয়; এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক শ্বাসনালি। কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর তেল, গ্যাস ও বাণিজ্যিক চলাচলের সঙ্গে এই পথ সরাসরি যুক্ত। ফলে প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে শুধু জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়া নয়; এর অর্থ হলো রপ্তানি, আমদানি, জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, পর্যটন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়া।
এখন প্রশ্ন উঠছে—হরমুজের বিকল্প কি সত্যিই সম্ভব? উপসাগরীয় দেশগুলো কী পরিকল্পনা করছে? আর সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হতে পারে?
হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবেশ ও বের হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এই পথ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং নানা ধরনের পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছেছে। তাই প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেলে উপসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্যিক নিরাপত্তা সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
বিশেষ করে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের ভৌগোলিক অবস্থান তাদের আরও বেশি অসহায় করে তোলে। এসব দেশের সমুদ্রসীমা মূলত উপসাগরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। তাই সমুদ্রপথে জ্বালানি ও পণ্য পাঠাতে হলে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করা ছাড়া তাদের হাতে কার্যকর কোনো সহজ বিকল্প নেই।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, কারণ তাদের কিছু জ্বালানি নলপথ রয়েছে, যা প্রণালির বাইরের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেয়। তবে সেই সক্ষমতা সীমিত। বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, সীমিত বিকল্প পথ থাকলেও তা বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংকট সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
নতুন জ্বালানি নলপথ: পরিকল্পনা আছে, কিন্তু বাস্তবতা কঠিন
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন সবচেয়ে বেশি ভাবছে নতুন জ্বালানি নলপথ নির্মাণ নিয়ে। ধারণাটি সহজ—তেল ও গ্যাস সরাসরি এমন বন্দরে নিয়ে যাওয়া, যেখান থেকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেই বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা যাবে।
কাগজে-কলমে পরিকল্পনাটি আকর্ষণীয়। এতে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমবে, রপ্তানি পথ বৈচিত্র্যময় হবে এবং যুদ্ধ বা উত্তেজনার সময় অর্থনীতি কিছুটা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে এমন অবকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল।
নতুন নলপথ বানাতে শুধু অর্থই লাগে না; লাগে বহু দেশের সম্মতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জমি ব্যবহার, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং আঞ্চলিক আস্থা। উপসাগরীয় অঞ্চলে যেখানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও কূটনৈতিক সন্দেহ আগে থেকেই রয়েছে, সেখানে যৌথ অবকাঠামো গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। কাতারের মতো দেশ এ খাতে হরমুজ প্রণালির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। বিকল্প গ্যাস নলপথের ধারণা আগেও উঠেছে, বিশেষ করে ট্রান্স-অ্যারাবিয়ান গ্যাস নলপথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু দূরত্ব, ব্যয়, রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে সেটি কখনো বাস্তব রূপ পায়নি।
কারণ ট্যাংকারের মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন অনেক ক্ষেত্রেই বেশি নমনীয় ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। এর বিপরীতে নলপথ একবার তৈরি হলে সেটি নির্দিষ্ট পথে সীমাবদ্ধ থাকে এবং রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
স্থলপথ: আপৎকালীন সমাধান, স্থায়ী বিকল্প নয়
হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কিছু পণ্য ও জ্বালানি ওমান ও সৌদি আরবের লোহিত সাগরঘেঁষা পথে ঘুরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে স্থলপথে পণ্য আনার চেষ্টা চলছে।
এই ব্যবস্থা আপৎকালীন সময়ে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এটি কখনোই হরমুজের মতো বড় সমুদ্রপথের পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। কারণ স্থলপথে পরিবহন ব্যয় বেশি, সময় বেশি লাগে এবং একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য আনা-নেওয়ার সক্ষমতা সীমিত।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক বড় বন্দর দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। দুবাইয়ের জেবেল আলির মতো বন্দর দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে এসব বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও চাপে পড়ে।
স্থলপথ ব্যবহার করলে পণ্য নামানো, পুনরায় পরিবহন, সীমান্ত পারাপার, শুল্ক প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন—সব মিলিয়ে খরচ অনেক বেড়ে যায়। ফলে এটি জরুরি সময়ের ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সমাধান হিসেবে দুর্বল।
রেলপথ: সম্ভাবনা আছে, কিন্তু বিলম্ব বড় বাধা
স্থলপথের তুলনায় রেলপথ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারত। যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক রেলসংযোগ থাকত, তাহলে পণ্য পরিবহন কিছুটা সহজ হতো। কিন্তু এই পরিকল্পনাও এখনো পূর্ণ বাস্তবতায় পৌঁছায়নি।
গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি সদস্য দেশকে যুক্ত করে একটি আঞ্চলিক রেলপথ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এই রেলপথ চালু হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভেতরে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন নতুন মাত্রা পেতে পারে। হরমুজের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সমস্যা হলো, প্রকল্পটি বহুবার পিছিয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সদস্য দেশগুলোর আলাদা অগ্রাধিকার এই বিলম্বের পেছনে বড় কারণ। ফলে রেলপথ এখনো সম্ভাবনার জায়গায় আছে, বাস্তব সমাধানের জায়গায় নয়।
ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর: বড় স্বপ্ন, দুর্বল ভিত্তি
হরমুজের বিকল্প হিসেবে আরেকটি আলোচিত ধারণা হলো ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর। ২০২৩ সালে চালু হওয়া এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল রেল ও নৌপথের সমন্বয়ে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে যুক্ত করা।
এই পথরেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খাল উভয়ের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো যেতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে বাস্তবতা এখানেও জটিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী নয়। ফলে এই করিডোরের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি পুরোপুরি কাল্পনিক নয়, কিন্তু এটি এখনো দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অবকাঠামো, রাজনৈতিক স্বীকৃতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ঘাটতি কাটিয়ে না উঠলে এই পথ দ্রুত কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বড় বাধা
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ধাক্কা উপসাগরীয় দেশগুলোকে একসঙ্গে ভাবতে বাধ্য করেছে। কিন্তু একসঙ্গে ভাবা আর একসঙ্গে কাজ করা এক বিষয় নয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। কে বড় বাণিজ্য কেন্দ্র হবে, কার বন্দর বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে, কোন দেশ জ্বালানি রপ্তানিতে এগিয়ে থাকবে, কে আঞ্চলিক পরিবহন কেন্দ্র হবে—এসব প্রশ্নে দেশগুলোর স্বার্থ অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই বাস্তবতায় যৌথ নলপথ, যৌথ রেলপথ বা যৌথ বাণিজ্য পথ তৈরি করা কঠিন। কারণ এমন প্রকল্পে এক দেশের লাভ অন্য দেশের কৌশলগত ক্ষতি হিসেবে দেখা হতে পারে। ফলে হরমুজ সংকট সাময়িকভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোচনা বাড়ালেও, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু তেল-গ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়
হরমুজ বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু তেল ও গ্যাস রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রভাব পড়েছে পর্যটন, অ্যালুমিনিয়াম, সার উৎপাদন এবং সাধারণ বাণিজ্যেও।
জ্বালানি সরবরাহে বাধা পড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়। পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়লে বাজারে দাম বাড়ে। পর্যটন খাত নিরাপত্তা উদ্বেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার সার উৎপাদনের মতো খাতও জ্বালানি ও কাঁচামাল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চাপের মুখে পড়ে।
এই কারণে হরমুজ সংকটকে শুধু সামুদ্রিক পথের সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে উপসাগরীয় অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে।
তাহলে হরমুজের বিকল্প কি সম্ভব?
প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো—আংশিকভাবে সম্ভব, কিন্তু পুরোপুরি নয়।
উপসাগরীয় দেশগুলো কিছু বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের বিদ্যমান জ্বালানি নলপথের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। স্থলপথ ও রেলপথ কিছু পণ্য পরিবহনে সাহায্য করতে পারে। ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর ভবিষ্যতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কিন্তু এগুলোর কোনোটিই অল্প সময়ে হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারবে না। কারণ হরমুজের ভৌগোলিক গুরুত্ব এতটাই বড় যে সেটিকে পাশ কাটাতে হলে শুধু নতুন রাস্তা বানালেই হবে না; দরকার রাজনৈতিক ঐক্য, বিপুল বিনিয়োগ, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক আস্থার পরিবেশ।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। বহু বছর ধরে তারা যে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভর করে নিজেদের জ্বালানি রপ্তানি ও বাণিজ্যিক শক্তি গড়ে তুলেছে, সেই পথ একবার বন্ধ হয়ে গেলে পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো কতটা নড়বড়ে হয়ে যায়, তা এখন স্পষ্ট।
তবে বিকল্প পথ খোঁজা যতটা জরুরি, তা বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। নতুন জ্বালানি নলপথ ব্যয়বহুল, স্থলপথ সীমিত, রেলপথ বিলম্বিত, আর ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় আটকে আছে।
তাই হরমুজের বিকল্প নিয়ে আলোচনা যতই জোরালো হোক, বাস্তবতা হলো—উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো এই প্রণালির কৌশলগত ছায়া থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ভবিষ্যতে তারা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে শুধু অবকাঠামোর ওপর নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আঞ্চলিক সমন্বয় এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর।
সিভি/এইচএম

