জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমানোর ঘোষণা ইউরোপের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব ন্যাটো, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জার্মানি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সেনা কমাবে। তিনি বলেছেন, এই সংখ্যা ৫ হাজারের চেয়েও বেশি হতে পারে। বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৬ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি। তাই এই সিদ্ধান্তকে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘোষণার পর দুটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। এক পক্ষ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর এটাই সময়। অন্য পক্ষের আশঙ্কা, এমন পদক্ষেপ ন্যাটোর ঐক্য দুর্বল করতে পারে এবং রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জো বাইডেন প্রশাসনের সময় জার্মানিতে দূরপাল্লার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রসহ একটি মার্কিন ব্যাটালিয়ন মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল। জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এমন সামরিক উপস্থিতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সেই পরিকল্পনা বাতিল করেছে। বার্লিনের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা, কারণ জার্মানি নিজেকে ইউরোপে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
এখানেই রাশিয়ার সম্ভাব্য লাভের জায়গা তৈরি হয়। জার্মানিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমে গেলে ইউরোপের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় একটি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। রাশিয়ার জন্য জার্মানি শুধু একটি ইউরোপীয় দেশ নয়; এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র এবং ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদার। তাই বার্লিনের নিরাপত্তা অবস্থান দুর্বল হলে মস্কোর জন্য পশ্চিমা জোটের ওপর চাপ তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
তবে জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বিষয়টিকে কেবল সংকট হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগ করতে বাধ্য করতে পারে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যদি ধীরে ধীরে ইউরোপ থেকে সামরিক উপস্থিতি কমায়, তবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নিতে হবে।
তবে প্রশ্ন হলো, ইউরোপ কি প্রস্তুত? ন্যাটোর বহু সদস্য রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে এসেছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো মার্কিন উপস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তা হিসেবে দেখে। পোল্যান্ড, বাল্টিক অঞ্চল এবং পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ মনে করে, মার্কিন সেনা উপস্থিতি শুধু সামরিক শক্তি নয়; এটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তাও।
এই কারণেই মার্কিন রাজনীতির ভেতর থেকেও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি উঠেছে। রিপাবলিকান পার্টির দুই শীর্ষ নেতা, সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার এবং হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান মাইক রজার্স, এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং এসব সেনাকে আরও পূর্ব দিকে সরিয়ে নেওয়া উচিত, যাতে রাশিয়ার কাছাকাছি অঞ্চলে ন্যাটোর প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার হয়।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি বাইরের শত্রুর চেয়ে জোটের ভেতরের ভাঙনকে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। এই মন্তব্য ন্যাটোর বর্তমান সংকটকে স্পষ্ট করে—শত্রু বাইরে থাকলেও দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে ভেতর থেকে।
এই পরিস্থিতি এমন সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক আগে থেকেই চাপের মধ্যে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধ, শুল্ক-সংক্রান্ত উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা অগ্রাধিকার নিয়ে ভিন্ন অবস্থান—সব মিলিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। জার্মানির পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, জার্মানিতে প্রায় ৩৬ হাজার মার্কিন সেনা থাকলেও ইতালিতে প্রায় ১২ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়। গত বছর ট্রাম্পের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রোমানিয়া থেকেও মার্কিন সেনা কমানো হয়েছিল। সেই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপ থেকে সামরিক মনোযোগ সরিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বাড়ানো। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে চীন এখন সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে ওয়াশিংটনের সামরিক অগ্রাধিকার ইউরোপ থেকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু ইউরোপের জন্য এর অর্থ ভিন্ন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো ইউরোপীয় নিরাপত্তার প্রধান সংকট। এমন সময়ে জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমানো রাশিয়ার কাছে পশ্চিমা জোটের দুর্বলতার সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে। মস্কো বুঝতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালে ইউরোপে মার্কিন প্রতিশ্রুতিও বদলে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই রাশিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা।
রাশিয়া সরাসরি সামরিক সুবিধা না পেলেও কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা পেতে পারে। ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি নিজেদের মধ্যে সন্দেহে ভুগতে শুরু করে, তবে রাশিয়ার জন্য বিভক্তি কাজে লাগানো সহজ হয়। ইউরোপের দেশগুলো যদি ভাবতে শুরু করে যে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে নাও পারে, তবে তাদের মধ্যে আলাদা আলাদা প্রতিরক্ষা নীতি তৈরি হতে পারে। এতে ন্যাটোর সম্মিলিত শক্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের সাম্প্রতিক মন্তব্যও এই উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তিনি ইরান যুদ্ধ নিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সেখানে অপদস্থ হচ্ছে এবং তেহরান তার অবস্থান শক্ত করেছে। এই মন্তব্যের পরই ট্রাম্প জার্মানি থেকে সেনা কমানোর ঘোষণা দেন। ফলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, সিদ্ধান্তটি শুধু সামরিক হিসাবের ফল নয়; এর পেছনে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও কাজ করেছে।
সব মিলিয়ে জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমানোর ঘোষণা ইউরোপের জন্য একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও পরীক্ষা। সতর্কবার্তা এই কারণে যে, ন্যাটোর ঐক্য আর আগের মতো নিশ্চিত নয়। পরীক্ষা এই কারণে যে, ইউরোপকে এখন প্রমাণ করতে হবে—যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কমলেও তারা নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করতে পারে কি না।
রাশিয়ার লাভ এখানেই। মস্কো হয়তো সঙ্গে সঙ্গে কোনো বড় সামরিক সুবিধা পাবে না, কিন্তু পশ্চিমা জোটে বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতা তৈরি হলে সেটাই রাশিয়ার জন্য বড় কৌশলগত অর্জন। কারণ আধুনিক ভূরাজনীতিতে শুধু ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সেনা সংখ্যা নয়; প্রতিপক্ষের জোট কতটা ঐক্যবদ্ধ, সেটিও শক্তির বড় মাপকাঠি।
জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা কমানোর সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি সামরিক পুনর্বিন্যাস নয়। এটি ইউরোপের নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ, ন্যাটোর ঐক্য এবং রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান—সব কিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপ যদি এই মুহূর্তকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, তবে সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি জোটের ভেতরের বিভক্তি আরও গভীর হয়, তাহলে এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লাভবান হতে পারে রাশিয়াই।
সিভি/এইচএম

