পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান একসময় ছিল এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঘটনা। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আগে তিনি ‘মা, মাটি, মানুষ’—এই তিন শব্দকে শুধু স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং এটিকে তিনি বাম শাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের ভাষায় পরিণত করেছিলেন। সেই আবেগ, সেই প্রতিবাদ এবং সেই রাজনৈতিক বার্তাই শেষ পর্যন্ত ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটায়।
এরপর এই তিন ‘ম’ হয়ে ওঠে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী শক্তির মূল ভিত্তি। নারী ভোটার, গ্রামীণ দরিদ্র, সংখ্যালঘু, স্থানীয় সংগঠন এবং মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখে। টানা তিনটি নির্বাচনী জয় সেই ভিত্তিকেই আরও দৃঢ় করে।
কিন্তু ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সেই পুরোনো সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এবার মমতার ‘মা, মাটি, মানুষ’ রাজনীতির সামনে দাঁড়িয়েছে নতুন পাঁচ ‘ম’—মুসলিম ভোট, মহিলা ভোট, অভিবাসী ভোটার, মতুয়া সম্প্রদায় এবং ভারতীয় জনতা পার্টির শক্তিশালী নির্বাচনী যন্ত্র। এই পাঁচটি বিষয় মিলেই এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সোমবার ৪ মে স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় ভোট গণনা শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক প্রবণতায় দেখা যায়, বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। গণনার প্রাথমিক পর্যায়ে বিজেপি ১৯৫টি আসনে এগিয়ে থাকার তথ্য সামনে আসে, আর তৃণমূল ১০০ আসনের ঘর পার করতেও কঠিন চাপে পড়ে। বিভিন্ন সময়ে গণনার প্রবণতায় সংখ্যায় ওঠানামা থাকলেও বিজেপির বড় অগ্রগতি এবং তৃণমূলের পিছিয়ে পড়ার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার পর এটিই ছিল প্রথম বড় নির্বাচন। ফলে ভোটের আচরণ, ভোটারদের উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই আগের নির্বাচনের তুলনায় আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
মহিলা ভোটার: পুরোনো শক্তি, নতুন প্রশ্ন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক সাফল্যের অন্যতম বড় ভিত্তি ছিল নারী ভোটার। গত এক দশকে নারীদের লক্ষ্য করে তৃণমূল সরকার বেশ কিছু কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালু করে। এর মধ্যে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নগদ সহায়তা প্রকল্প এবং ‘কন্যাশ্রী’ ছিল সবচেয়ে আলোচিত।
এই প্রকল্পগুলো মমতার প্রতি নারী ভোটারদের একটি বড় অংশকে দীর্ঘদিন ধরে অনুকূল রেখেছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারে এই সহায়তাগুলো সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল। ফলে তৃণমূলের নির্বাচনী প্রচারে নারী কল্যাণ সব সময়ই বড় জায়গা পেয়েছে।
কিন্তু ২০২৬ সালে ছবিটা আগের মতো সরল ছিল না। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিও এবার নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে জোরালো প্রচার চালায়। শুধু অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, নারী নিরাপত্তাকেও তারা বড় নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করে।
আরজি কর মেডিকেল কলেজের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা এই নির্বাচনে তীব্র রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। বিজেপি এই ঘটনাকে সামনে এনে তৃণমূল সরকারের আইনশৃঙ্খলা ও নারী নিরাপত্তা প্রশ্নে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলে। এমনকি পানিহাটি আসন থেকে ওই ঘটনার শিকার নারীর মাকে প্রার্থী করা হয়, যা নির্বাচনী প্রচারে আবেগ ও প্রতীকের নতুন মাত্রা যোগ করে।
এতে বোঝা যায়, শুধু কল্যাণমূলক প্রকল্প দিয়ে নারী ভোটার ধরে রাখা আর আগের মতো সহজ নেই। নারী ভোটাররা এখন নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
মুসলিম ভোট: তৃণমূলের নির্ভরতার জায়গায় চাপ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মুসলিম ভোট সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ ভোটার মুসলিম। এই ভোটব্যাংক অনেক আসনে জয়-পরাজয়ের হিসাব বদলে দিতে পারে।
২০২১ সালে মুসলিম-প্রধান আসনগুলোতে তৃণমূলের বড় জয়ের পেছনে সংখ্যালঘু ভোটের একত্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিজেপির উত্থানের মুখে মুসলিম ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূলের পক্ষে একত্রিত হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজেকে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিরোধশক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।
কিন্তু ২০২৬ সালে সেই একত্রীকরণ কতটা অটুট ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো মুসলিম-প্রধান জেলাগুলোতে ভোটের ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। উন্নয়ন, স্থানীয় প্রশাসন, ভোটার তালিকা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ার কথা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
তৃণমূলের জন্য সমস্যা আরও বেড়েছে কারণ মুসলিম ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উপস্থিতি বেড়েছে। কংগ্রেস আবার কিছু এলাকায় নিজেদের পুরোনো জমি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনকে সম্ভাব্য ভোট কাটার শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে সংখ্যালঘু ভোটের একক প্রবাহ দুর্বল হলে তৃণমূলের আসনভিত্তিক হিসাব বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অভিবাসী ভোটার: অদৃশ্য শক্তি থেকে দৃশ্যমান প্রভাব
এবারের নির্বাচনে অভিবাসী ভোটার একটি বড় অনিশ্চিত ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ কাজের জন্য অন্য রাজ্যে থাকেন। সাধারণত এদের বড় অংশ ভোটের সময় এলাকায় ফিরতে পারেন না। কিন্তু এবার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় বহু পরিযায়ী শ্রমিক নিজ নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। তাদের মধ্যে অনেকের আশঙ্কা ছিল, ভোট না দিলে ভবিষ্যতে পরিচয়, নাগরিক অধিকার বা সরকারি সুবিধা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে ভোটের মাঠে এমন এক শ্রেণির ভোটারের উপস্থিতি বাড়ে, যাদের আচরণ সব সময় পূর্বাভাসে ধরা যায় না।
এই ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ, নিরাপত্তাহীনতা, জীবিকার চাপ এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে একটি আলাদা মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে। তারা স্থানীয় রাজনীতির প্রচলিত আনুগত্যের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে ফলাফলে বড় প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
মতুয়া সম্প্রদায়: নাগরিকত্ব রাজনীতির কেন্দ্রে
পশ্চিমবঙ্গের তফসিলি জাতিভুক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে মতুয়া সম্প্রদায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি। রাজ্যের প্রায় ১৭ শতাংশ তফসিলি জাতিভুক্ত মতুয়া ভোটার অনেক আসনে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখেন।
এই সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব, পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নে রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল। বিজেপি গত কয়েক বছরে মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শক্তিশালী ভিত্তি গড়ার চেষ্টা করেছে। নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ এই সম্প্রদায়ের একটি অংশকে বিজেপির দিকে টেনে নিয়েছে।
তৃণমূলও মতুয়া ভোট ধরে রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই সম্প্রদায়ের ভোট কোন দিকে বেশি ঝুঁকেছে, তা ফলাফলের বড় ব্যাখ্যা হতে পারে। মতুয়া ভোটে সামান্য পরিবর্তনও বহু আসনে তৃণমূলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্র: সংগঠনে পাল্টা চাপ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে ক্যাডারভিত্তিক। বাম আমলে এই কাঠামো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। পরে তৃণমূল সেই সংগঠনভিত্তিক রাজনীতিকে নিজের মতো করে ব্যবহার করে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
কিন্তু এবার বিজেপি শুধু প্রচারে নয়, সংগঠনেও বড় জোর দিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, রাজ্য নেতৃত্ব, বুথ পর্যায়ের কর্মী, ডিজিটাল প্রচার, ভোটার যোগাযোগ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে বিজেপি একটি সুসংগঠিত যন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।
এই সংগঠিত প্রচার তৃণমূলের স্থানীয় কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। আগে যেখানে তৃণমূলের মাঠপর্যায়ের সংগঠন ছিল বড় সুবিধা, সেখানে এবার বিজেপি সেই জায়গাতেই পাল্টা শক্তি দেখিয়েছে। নির্বাচনী প্রবণতায় বিজেপির বড় অগ্রগতির পেছনে এই সংগঠনগত প্রস্তুতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুরোনো স্লোগানের সামনে নতুন বাস্তবতা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মা, মাটি, মানুষ’ স্লোগান একসময় ছিল পরিবর্তনের প্রতীক। কিন্তু দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর যেকোনো রাজনৈতিক দলের সামনে যে সমস্যা তৈরি হয়, তৃণমূলও এখন তার মুখোমুখি। শাসন দীর্ঘ হলে মানুষের প্রত্যাশা বদলায়, ক্ষোভ জমে, স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ে, আর বিরোধীরা নতুন ভাষা খুঁজে পায়।
২০২৬ সালের নির্বাচন সেই বদলে যাওয়া প্রত্যাশার প্রতিফলন হতে পারে। নারী ভোটাররা শুধু প্রকল্প নয়, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার চাইছেন। মুসলিম ভোটাররা শুধু বিজেপিবিরোধী অবস্থান নয়, বাস্তব উন্নয়ন ও প্রশাসনিক নিশ্চয়তা চাইছেন। অভিবাসী ভোটাররা নিজের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে চিন্তিত। মতুয়া সম্প্রদায় নাগরিকত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে সংবেদনশীল। আর বিজেপি সংগঠনের শক্তি দিয়ে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নির্বাচনী সুবিধাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
ফলাফল এখনো প্রবণতা, কিন্তু বার্তা স্পষ্ট
গণনার প্রাথমিক তথ্য চূড়ান্ত ফলাফল নয়। আসনভিত্তিক ফল শেষ পর্যন্ত বদলাতে পারে। তবে প্রাথমিক প্রবণতাই অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা দেয়। ৪ মে ভোট গণনার সময় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং তৃণমূলের চাপ স্পষ্ট করে যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নতুন মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
এবারের নির্বাচন শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপির লড়াই নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক জোট, ভোটার মনস্তত্ত্ব, নাগরিকত্ব রাজনীতি, নারী নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু সমীকরণ এবং সংগঠনগত শক্তির লড়াই। মমতার তিন ‘ম’ একসময় বাংলার রাজনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই তিন ‘ম’-এর সামনে নতুন পাঁচ ‘ম’ যে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
পশ্চিমবঙ্গের ভোট তাই শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; এটি ভারতীয় রাজনীতির বড় পরিবর্তনেরও একটি ইঙ্গিত হতে পারে। কারণ, যে বাংলাকে দীর্ঘদিন বিজেপির জন্য কঠিন জমি মনে করা হতো, সেই বাংলাতেই যদি বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগোয়, তাহলে তার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতেও পড়বে।
শেষ পর্যন্ত ফল যেদিকেই যাক, একটি বিষয় স্পষ্ট—পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা আর শুধু পুরোনো স্লোগানে আবেগী হচ্ছেন না। তারা নিরাপত্তা, পরিচয়, উন্নয়ন, প্রশাসন, সংগঠন এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আর সেখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরোনো রাজনৈতিক সূত্র এবার সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

