মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে খবর প্রকাশিত হলেও সেই ধারণাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
১৩ জুন প্রকাশিত এক বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা চলছে, তা এখনো এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছেনি যেখানে চূড়ান্ত চুক্তির কথা বলা যায়। তার মতে, কূটনৈতিক আলোচনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই নানা ধরনের গুঞ্জন ও অনুমানভিত্তিক তথ্য প্রচার পরিস্থিতিকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য যথাসময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। এর আগে বিভিন্ন মাধ্যমে যে সম্ভাব্য শর্ত, কাঠামো বা সমঝোতার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোকে এখনই চূড়ান্ত বা নির্ভরযোগ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে সংঘাত শুরু হয়, তা দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। বিভিন্ন সময়ে হামলা, পাল্টা হামলা এবং রাজনৈতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তবে সংঘাতের মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। উভয় পক্ষই আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ ধারণা করছিলেন যে, দুই দেশ হয়তো একটি বৃহত্তর সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু ইরানের সর্বশেষ অবস্থান সেই প্রত্যাশাকে অনেকটাই শীতল করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে যা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো ইস্যুগুলো তেহরানের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
এ কারণেই ইরান কোনো ধরনের তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না। দেশটির নেতৃত্ব মনে করে, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিষয়ে পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা ছাড়া সমঝোতায় পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চাইছে এমন একটি কাঠামো, যেখানে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের ভিত্তিতে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও চূড়ান্ত সমাধানের পথ এখনো জটিল ও দীর্ঘ বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
আব্বাস আরাগচির বক্তব্য মূলত একটি সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, আলোচনার টেবিলে বসা মানেই চুক্তি হয়ে যাওয়া নয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে আশাবাদী চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে দেশটি এখনো নিজেদের কৌশলগত অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে চায় এবং কোনো চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা নেই। ফলে শান্তি চুক্তি নিয়ে যত আলোচনা-ই হোক না কেন, বাস্তব অগ্রগতি দেখতে আরও সময় লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত থাকলেও চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা এখনই আসছে না। বরং দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আগামী দিনের কূটনৈতিক আলোচনা, পারস্পরিক আস্থা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির পরিবর্তন।

