বিশ্ব জ্বালানি বাজার বর্তমানে এক অস্থির সময় পার করছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ সাতটি তেল উৎপাদনকারী দেশ।
রবিবার নেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এই দেশগুলো তেলের উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো—বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ ঘাটতি কমানো এবং ক্রমবর্ধমান দামের চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা ও যুদ্ধের কারণে তেলের পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, কাজাখস্তান, আলজেরিয়া ও ওমান—এই সাত দেশ ভার্চুয়াল বৈঠকে বসে প্রতিদিন ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। জুন মাস থেকে এই বাড়তি উৎপাদন কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। এর বড় অংশ আসবে সৌদি আরব ও রাশিয়ার কাছ থেকেই, যারা বৈশ্বিক তেল বাজারে সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই শক্তি হিসেবে বিবেচিত।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ফলে তেলের স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথে পরিণত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট নতুন কিছু নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল। কারণ, বিশ্ব অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি, আর তার ওপর জ্বালানির দামের এমন অস্থিরতা নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। হরমুজ প্রণালি যদি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
অন্যদিকে, এই সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যেই ভোক্তা পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত শুরুর আগে যেখানে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার, সেখানে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৫ ডলারে। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে দাম।
এই পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদও দেখানো হচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, সংঘাত শেষ হলে জ্বালানির দাম আবার কমে আসতে পারে। তার মতে, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি মূলত যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তার ফল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাজারও ধীরে ধীরে ভারসাম্যে ফিরে আসবে।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই উৎপাদন বৃদ্ধি কতটা কার্যকর হবে? অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, উৎপাদন বাড়ানো সাময়িকভাবে দাম স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করলেও, মূল সমস্যা রয়ে যাচ্ছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। যতক্ষণ পর্যন্ত সংঘাত চলবে, ততক্ষণ বাজারে অস্থিরতা পুরোপুরি কাটবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা। এটি জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কারণ, বড় উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় কমে গেলে ভবিষ্যতে এমন যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখন এক জটিল সমীকরণের মধ্যে রয়েছে। একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে। উৎপাদন বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে হলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
সিভি/এইচএম

