অ্যাক্সিওস রিপোর্ট—
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শিগগির একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর একজন কূটনীতিক এবং একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, এই সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে কোনো টোল ছাড়াই পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়নে ইরানের সহযোগিতার ভিত্তিতে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হবে।
এদিকে, দুটি সূত্র জানিয়েছে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত ইরানের উচ্চ পর্যায়ে চুক্তিটি অনুমোদিত হলেও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্ভবত এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি।
চুক্তিটি কাতার ও পাকিস্তান যৌথভাবে মধ্যস্থতা করেছে। উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করলে এর নাম ইসলামাবাদ চুক্তি হবে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম অ্যাক্সিওস।
প্রতিবেদনের তথ্য মতে, এই সমঝোতা কার্যকর হলে ইরান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হবে এবং এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলবে। সমঝোতার খসড়ায় ইরানের সমৃদ্ ইউরেনিয়াম মজুতের বিষয়টি সমাধানের একটি কাঠামো রয়েছে। তবে, পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বাস্তব পদক্ষেপ একটি দ্বিতীয় ও আরও বিস্তারিত চুক্তির ওপর নির্ভর করবে।
সর্বশেষ খসড়া সম্পর্কে অবগত মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর একজন কূটনীতিক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তির বর্ণনায় একমত হয়েছে। তবে, চুক্তিটি এখনও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন ওই কূটনীতিক।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন সপ্তাহান্তেই একটি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। তবে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তেহরান এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
দুই কূটনীতিক ও দুই মার্কিন কর্মকর্তার মতে, বুধবার রাতে দীর্ঘ আলোচনার পর কাতারের মধ্যস্থতাকারী আলিও আল থাওয়াদি এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে এই প্রাথমিক সমঝোতা হয়। আলোচনার সময় আল-থাওয়াদি একাধিকবার ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকভ এবং জারেড কুশনারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
চুক্তিতে কী রয়েছে?
সমঝোতা অনুযায়ী ইরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে, কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে চলমান অচলাবস্থা সমাধান করবে। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনায় অংশ নেবে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প এমন একটি বিকল্পে সম্মত হয়েছেন যাতে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দেশটির ভেতরেই নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করা যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও নিষেধাজ্ঞা
সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে টোলমুক্তভাবে খুলে দেওয়া হবে। ৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধপূর্ব জাহাজ চলাচলের মাত্রা পুনঃস্থাপন করা হবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা পূর্বে জানিয়েছিলেন, প্রণালি পুনরায় চালুর পর ইরানকে ৬০ দিনের জন্য অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা-ছাড় দেওয়া হতে পারে, যাতে দেশটি তেল বিক্রি করে রাজস্ব অর্জন করতে পারে।
জব্দকৃত অর্থের প্রশ্ন
বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদের কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ইরান চায় চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু অর্থ মুক্ত করা হোক। যুক্তরাষ্ট্র চায় চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতে ধাপে ধাপে অর্থ ছাড়া হোক।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও কাতার এমন একটি ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনা করেছে, যার মাধ্যমে কাতারে আটকে থাকা কিছু ইরানি অর্থ মানবিক পণ্য কেনার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
একজন কূটনীতিক বলেছেন, আমরা চুক্তির শেষ মুহূর্তের বিষয়গুলো চূড়ান্ত করছি এবং স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণে কাজ করছি।
প্রসঙ্গত, জেনেভা শহরে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথবাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশকিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এর প্রতিবাদে ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান।
এরপর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়া ১৩ এপ্রিল হরমুজে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়। এরপর কয়েক দফা যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ান ট্রাম্প।
ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন সংস্থার তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সংঘাতে মোট ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হন, যার মধ্যে ২ হাজার ৮৭৫ জন পুরুষ এবং ৪৯৬ জন নারী। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হন এবং ২৬ জন নিহত হন।

