ইরানের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—এমন দাবি তুলে হরমুজ প্রণালিতে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে শুরু হওয়া ‘মুক্তি অভিযান’ স্বল্প সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা যায় কি না, তা দেখা যায়।
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযানটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা দিয়েছিলেন। ফলে ট্রাম্পের হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় বার্তা বহন করছে।
গত সোমবার সকাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা বিভিন্ন দেশের জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করানোর জন্য অভিযান শুরু করেছিল। ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর এই পদক্ষেপ নেয় ওয়াশিংটন। কারণ, হরমুজ প্রণালি শুধু আঞ্চলিক জলপথ নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এর জেরে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই অস্থিরতা এখন শুধু সামরিক সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর বার্তায় বলেন, নৌ অবরোধ পুরোপুরি বহাল থাকবে। তবে ‘মুক্তি অভিযান’ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হবে, যাতে একটি চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষর করার সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর এই বক্তব্যে পরিষ্কার বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে কূটনীতির দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না।
এই সিদ্ধান্তের পরপরই তেলের বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ চুক্তির দর ২ দশমিক ৩০ ডলার কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই ১০০ ডলারের সীমা বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই দামের এই পতন ইঙ্গিত দেয়, বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ট্রাম্পের ঘোষণাকে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। চুক্তির বিষয়ে আসলে কী ধরনের অগ্রগতি হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। এই স্থগিতাদেশ কত দিন থাকবে, সেটিও নিশ্চিত নয়। হোয়াইট হাউসের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে আজ বুধবার সকাল পর্যন্ত তেহরানের পক্ষ থেকেও ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি।
ঘটনাটিকে শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে একাধিক হিসাব কাজ করছে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তা দ্রুত বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। জলমাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌযান ব্যবহারের হুমকি দিয়ে ইরান ইতিমধ্যে প্রণালিটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ইরানের বন্দরে অবরোধ আরোপ করেছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা পাহারার ব্যবস্থা নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামান্য ভুল হিসাবও বড় যুদ্ধের কারণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে চাপ বাড়ছে। এ বছর নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে। বিশেষ করে গ্যাসের দাম ভোটারদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক মূল্যও কম নয়। সামরিক শক্তি দেখানো এক বিষয়, কিন্তু সেই যুদ্ধের কারণে যদি ভোটারদের পকেটে চাপ পড়ে, তাহলে সেটি নির্বাচনের মাঠে বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, ট্রাম্প নিজেও এখন দাবি করছেন, ইরানের সামরিক শক্তি অনেক দুর্বল হয়ে গেছে এবং তেহরান প্রকাশ্যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে শান্তি চায়। তাঁর বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, তিনি এই মুহূর্তে সামরিক সাফল্যের দাবি ধরে রেখে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যাওয়ার পথ খোলা রাখতে চান। এটি তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবেও সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ, তিনি বলতে পারবেন—যুক্তরাষ্ট্র শক্ত অবস্থান নিয়েছে, লক্ষ্য অর্জন করেছে, এখন শান্তির সুযোগ দিচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক অভিযানে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করেছে। তিনি জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে শুরু হওয়া ‘প্রচণ্ড ক্রোধ অভিযান’ শেষ হয়েছে। রুবিওর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র আর অতিরিক্ত উত্তেজনা তৈরি করতে চায় না। এই বক্তব্য ট্রাম্পের ঘোষণার সঙ্গে মিলে যায়। অর্থাৎ ওয়াশিংটন এখন এমন এক অবস্থান নিতে চাইছে, যেখানে তারা সামরিকভাবে শক্তিশালী দেখাবে, কিন্তু একই সঙ্গে আলোচনার সুযোগও রাখবে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। রুবিও জানিয়েছেন, এই সংঘাতে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ জন বেসামরিক নাবিক রয়েছেন। হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোর ক্রুরা অনাহার ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন বলেও তিনি জানান। এই মানবিক সংকট যুদ্ধের আরেকটি ভয়াবহ দিক সামনে আনে। কারণ, সামরিক ও কূটনৈতিক বিবৃতির আড়ালে আটকে পড়া সাধারণ নাবিক ও শ্রমিকদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ইরানের অবস্থানও স্পষ্ট। তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। ইরান বলছে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নের অধিকার তাদের আছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণও তারা সেই অধিকারের অংশ বলে মনে করে, কারণ তারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সদস্য। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম এবং হামাস ও হিজবুল্লাহকে সমর্থন আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে ফারাক এতটাই বড় যে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো সহজ নয়। তবে ট্রাম্পের সাময়িক স্থগিতাদেশ ইঙ্গিত দেয়, অন্তত এই মুহূর্তে উভয় পক্ষই সরাসরি আরও বড় সংঘাতে যেতে আগ্রহী নয়। যদিও নৌ অবরোধ বহাল রাখার কথা বলে ট্রাম্প বুঝিয়ে দিয়েছেন, চাপের নীতি পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সরাসরি শান্তি আলোচনায় বসেছিলেন, তবে সেই আলোচনা সফল হয়নি। পরবর্তী বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা চললেও এখনো তা ফল দেয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা এখনো চলছে।
আরাগচি আজ বুধবার সকালে বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন। সেখানে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্পেরও এই মাসে চীন সফরের কথা রয়েছে। ফলে চীনও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে—বিশেষ করে যখন যুদ্ধ, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান গতকাল বলেছেন, সংঘাত এখনই শেষ হলেও এর প্রভাব সামাল দিতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে। এই মন্তব্য পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়। যুদ্ধ থামলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানির দাম, বাণিজ্যপথ, বীমা ব্যয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা—সবকিছু আবার স্থিতিশীল হতে সময় লাগবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে একধরনের কৌশলগত বিরতি বলা যায়। এটি পূর্ণ শান্তির ঘোষণা নয়, আবার যুদ্ধ বাড়ানোর ঘোষণাও নয়। বরং এটি এমন এক রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ ধরে রেখে আলোচনার সম্ভাবনা পরীক্ষা করতে চাইছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে এই বিরতি যদি স্থায়ী সমঝোতার দিকে যায়, তাহলে বিশ্ববাজার কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কিন্তু যদি আলোচনার পথ ভেঙে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আবার দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ট্রাম্পের ঘোষিত এই সাময়িক স্থগিতাদেশ কি সত্যিই শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ, নাকি এটি কেবল আরও বড় চাপ প্রয়োগের আগে কৌশলগত বিরতি? উত্তর নির্ভর করছে ওয়াশিংটন, তেহরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—হরমুজ প্রণালির সংকট এখন শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিষয় নয়; এটি জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিভি/এইচএম

