চীন সফরে গিয়ে ইরান তাদের কূটনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিংয়ে বৈঠকের মাধ্যমে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য তুলে ধরেছেন, যা বর্তমান আঞ্চলিক সংকট ও ভবিষ্যৎ কৌশল—দুই দিক থেকেই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বুধবার (৬ মে ২০২৬) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান এই তিনটি লক্ষ্য শুধু জানায়নি, বরং চীনের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া ও আশ্বাসও পেয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক চাপ ও সংঘাতের মধ্যে তেহরান তাদের কূটনৈতিক পরিসর আরও শক্ত করতে চাইছে।
প্রথমত, ইরান তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে চেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তারা চীনকে বুঝাতে চেয়েছে যে, তারা যুদ্ধের একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোতে আগ্রহী। তবে সেই সমাধান এমন হতে হবে, যা ইরানের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ন্যায্য ও বিস্তৃত চুক্তির পথ তৈরি করবে। অর্থাৎ, ইরান একদিকে শান্তির কথা বলছে, অন্যদিকে নিজেদের জাতীয় স্বার্থে কোনো আপস করতে রাজি নয়—এই বার্তাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় লক্ষ্যটি ছিল চীন-ইরান সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীনের ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য চীন সফর এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আলোচনা চলছে, তখন ইরান নিশ্চিত হতে চাইছে যে বেইজিং তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেবে না। ইরান চেয়েছে, চীন যেন ভবিষ্যতেও কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাদের পাশে থাকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চীন এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে, যা তেহরানের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির বিষয়।
তৃতীয় লক্ষ্যটি ছিল আরও দূরদর্শী। ইরান শুধু বর্তমান সংঘাত নয়, বরং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়েও ভাবছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কীভাবে বজায় রাখা যাবে—এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে আলোচনায়। উভয় দেশই মনে করছে, পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে চীনের ভূমিকা থাকতে পারে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ইরান একটি বহুমাত্রিক বার্তা দিয়েছে। একদিকে তারা দেখাতে চায় যে তারা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যেও তারা বিকল্প কূটনৈতিক পথ খোলা রাখছে।
চীন এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কারণ একদিকে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা রয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। এই বাস্তবতায় ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের এই তিন লক্ষ্য শুধু একটি সফরের আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। যুদ্ধ, কূটনীতি এবং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে সামনে এনে তেহরান যে বার্তা দিতে চেয়েছে, তা হলো তারা এখন শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং পরিকল্পিত ও সক্রিয় কূটনীতির পথে হাঁটছে।

