ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এখন এমন এক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি, যার উদাহরণ দেশটির ইতিহাসে খুব একটা দেখা যায়নি। বিধানসভা নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের পরও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও ক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুত নন। বরং তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করবেন না। আর এই অবস্থান থেকেই তৈরি হয়েছে এক নতুন সাংবিধানিক সংকট।
রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ না করেন, তাহলে কি পশ্চিমবঙ্গে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে?
কারণ, বৃহস্পতিবার ৭ মে রাত ১২টার পর বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপি ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা আগামী ৯ মে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর দিনে নতুন সরকার গঠন করে শপথ নেবে। অর্থাৎ মাঝখানে প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি ফাঁক তৈরি হচ্ছে। আর এই সময়টাকেই ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
ভারতের সাংবিধানিক রীতিতে সাধারণত নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হওয়ার পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের কাছে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরপর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সীমিত ক্ষমতায় দায়িত্ব পালন করেন। এটি শুধু আইনি বিষয় নয়, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সৌজন্যও।
কিন্তু এবার সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনকে ‘পরাজয়’ হিসেবে স্বীকার করতেই নারাজ। তার অভিযোগ, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে তিনি রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগ করবেন না বলেই অবস্থান নিয়েছেন।
এই অবস্থান পশ্চিমবঙ্গকে এমন এক সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যার স্পষ্ট নজির অতীতে খুব কমই পাওয়া যায়। প্রবীণ আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানের ১৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো সরকার আর এক মুহূর্তও ক্ষমতায় থাকতে পারে না। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ১ মিনিটের পর বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা শেষ হয়ে যাবে।
সেক্ষেত্রে যদি মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করেন, তাহলে রাজ্যপালের সামনে দুটি পথ খোলা থাকতে পারে। প্রথমত, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবিলম্বে পদত্যাগের নির্দেশ দিতে পারেন এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে বলতে পারেন। দ্বিতীয়ত, যদি সেই প্রক্রিয়াও কার্যকর না হয়, তাহলে সাময়িক সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে।
ভারতের বর্ষীয়ান আইনজীবী হরিশ সালভেও এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। কারণ সাধারণত বিদায়ী সরকার সাংবিধানিক রীতি মেনেই সরে দাঁড়ায়। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত ধারাই ভেঙে গেছে।
এদিকে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ইতোমধ্যেই ২৯৩টি বিধানসভা আসনের নির্বাচিত সদস্যদের গেজেট নোটিফিকেশন রাজ্যপালের কাছে জমা দিয়েছেন। ফলে সাংবিধানিকভাবে নতুন সরকার গঠনের পথও প্রস্তুত। এখন রাজ্যপাল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা কে হবেন এবং তারা কবে শপথ নেবেন—সেই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবস্থান কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি তার রাজনৈতিক কৌশলেরও অংশ হতে পারে। তিনি হয়তো নিজের সমর্থকদের কাছে এই বার্তা দিতে চাইছেন যে, তিনি এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বিজেপির বিজয়কে সহজভাবে মেনে নিচ্ছেন না।
তবে এই কৌশল রাজ্যের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এখন পুরো নজর রাজ্যপাল, কেন্দ্রীয় সরকার এবং আগামী ৯ মে’র শপথ অনুষ্ঠানের দিকে। শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক রীতি অনুসরণ করে পরিস্থিতি শান্তভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, নাকি পশ্চিমবঙ্গ সত্যিই একদিনের রাষ্ট্রপতি শাসনের মতো বিরল ঘটনার সাক্ষী হবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সিভি/এইচএম

